প্রবাসীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিতে নানা উদ্যোগ, কারিগরি শিক্ষায় জোর দিচ্ছে সরকার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ২৫টি ট্রলি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে ট্রলিগুলো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। যেসব এজেন্সি কর্মী পাঠানোর নামে অনিয়ম ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় কেউ যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
প্রবাসীদের বিমানবন্দরে সেবা গ্রহণ আরও সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের যাতায়াতের সময় বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা এবং ভোগান্তি কমানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যেই বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রবাসীদের কল্যাণে ‘প্রবাসী কার্ড’ ও ‘প্রবাসী ব্যাংক’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে সরকার কাজ করছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা আরও সহজলভ্য করা এবং তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তা করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা সরাসরি শোনার জন্য সিলেট ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সপ্তাহে অন্তত এক দিন সময় বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে প্রবাসীরা স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের সমস্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পৃথিবী যত দিন থাকবে, সমস্যা তত দিনই থাকবে। তবে সমস্যার সমাধানে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত আট মাসে ধাপে ধাপে প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি কমানো এবং তাঁদের জন্য সহজ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রবাসীদের ভ্রমণ-সংক্রান্ত ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি তাঁদের কল্যাণে অন্যান্য সেবাও আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সেবাব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ বাড়াতে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কর্মীদের কাজভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
এ লক্ষ্যে দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কওমি মাদরাসাগুলোতেও কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সম্প্রসারিত হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীদের কাজ পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মান, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স নির্বাচন এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীদের বিমানবন্দর সেবা উন্নয়ন, প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা এবং কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ—এসব বিষয়কে প্রবাসীকল্যাণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন মন্ত্রী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি এবং প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের দেশে আসা-যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৫টি ট্রলি হস্তান্তরের উদ্যোগকে প্রবাসীদের সেবা উন্নয়নের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সেবার মানোন্নয়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর।
ট্রলি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ, সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সিলেট জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহবুবর রব চৌধুরী ফয়সল উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের সেবা সহজীকরণ ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধ, বিমানবন্দরে হয়রানি কমানো এবং দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসীকল্যাণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

