যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২৫ উড়োজাহাজের চুক্তির পর ইউরোপীয় নির্মাতার কাছ থেকে আরও ১০টি সংগ্রহের উদ্যোগ; বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয় ও লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের সঙ্গে বড় অঙ্কের ক্রয়চুক্তির পর এবার ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দুই আন্তর্জাতিক নির্মাতার কাছ থেকে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তি করল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকায় এয়ারবাসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে রয়েছে ছয়টি এ৩২১নিও ও চারটি এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাহিদা পূরণ এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থায়নের শর্ত, সরবরাহসূচি, পরিচালন ব্যয় এবং নতুন রুটের লাভজনকতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে দুই দফায় ২৫ উড়োজাহাজ
চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ওই চুক্তিতে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর পাঁচ মাস পর, ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সম্পূরক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ যুক্ত হয়।
ফলে দুই দফায় বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট ক্রয়াদেশ দাঁড়ায় ২৫টিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বোয়িংয়ের এসব চুক্তি গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তুলে ধরা হয়।
তবে উড়োজাহাজ ক্রয়কে ঘিরে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি বিমানের নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনার বিষয়।
এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন অধ্যায়
বোয়িংয়ের সঙ্গে সর্বশেষ চুক্তির মাত্র দুই সপ্তাহ পর বুধবার রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন এবং এয়ারবাসের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইয়ুর্গেন ভেস্টারমায়ার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, কূটনীতিক এবং বিমান পরিবহন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন চুক্তির আওতায় চারটি এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ মূলত দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং ছয়টি এ৩২১নিও আঞ্চলিক ও মধ্যম দূরত্বের রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানবহরে নির্মাতাভিত্তিক বৈচিত্র্য আসবে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি অবকাঠামোয় অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাজ্য–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ব্রিটিশ পক্ষ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ জনবল উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
এয়ারবাস ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান হলেও এর উড়োজাহাজ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের বিমানশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ রয়েছে।
চুক্তির সঙ্গে বিমানের পাইলট, প্রকৌশলী এবং রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই সহযোগিতা বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
তবে প্রশিক্ষণের পরিধি, বাস্তবায়নসূচি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ছয় মাসে ৩৫ উড়োজাহাজ: বড় পরিকল্পনা, বড় আর্থিক দায়
এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে বিমানের তিনটি ক্রয়চুক্তিতে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস।
বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। ফলে নতুন ক্রয়াদেশের পরিমাণ বিদ্যমান বহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অবশ্য ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হওয়া এবং উড়োজাহাজ বাস্তবে বহরে যুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। উড়োজাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে পুরোনো উড়োজাহাজ অবসরে যাওয়া, নতুন রুট চালু এবং বহর ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের ওপর ভবিষ্যৎ বহরের প্রকৃত আকার নির্ভর করবে।
বড় ধরনের বহর সম্প্রসারণের জন্য শুধু উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্য নয়, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমানবন্দরসেবা, জনবল এবং পরিচালন মূলধনেরও প্রয়োজন হবে।
বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার বহর কতটা লাভজনক?
দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে বোয়িং ৭৮৭ ও এয়ারবাস এ৩৫০ এবং আঞ্চলিক রুটে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ও এয়ারবাস এ৩২১নিও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এতে বিভিন্ন রুটের যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী উড়োজাহাজ নির্বাচনে নমনীয়তা বাড়তে পারে।
তবে দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনায় আলাদা পাইলট প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল দক্ষতা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। ফলে বহরে বৈচিত্র্যের পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় নতুন উড়োজাহাজের সম্ভাব্য আয়, পরিচালন ব্যয়, যাত্রীসংখ্যা এবং রুটভিত্তিক লাভজনকতার বাস্তবসম্মত হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দূরপাল্লার ফ্লাইটে পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করা না গেলে আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত আর্থিক সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
আঞ্চলিক বিমান চলাচলকেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য
সরকার বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
দেশের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এই সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ যথেষ্ট নয়।
এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, সময়ানুবর্তিতা, উন্নত যাত্রীসেবা, বিমানবন্দরের সক্ষমতা এবং দক্ষ ট্রানজিট ব্যবস্থাপনা।
বিমান কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন ক্রয়াদেশের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা।
চুক্তির অর্থায়ন ও সরবরাহসূচি কতটা স্পষ্ট?
বোয়িংয়ের সঙ্গে এপ্রিলের চুক্তির আনুমানিক মূল্য প্রকাশিত হলেও পরবর্তী ১১টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।
নতুন উড়োজাহাজগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, ঋণ বা রপ্তানি ঋণসহায়তার শর্ত কী থাকবে এবং বিমানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় কতটা পড়বে—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
একইভাবে সব উড়োজাহাজের চূড়ান্ত সরবরাহসূচিও প্রকাশ করা হয়নি।
সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হলে পরিকল্পিত রুট সম্প্রসারণ ও সম্ভাব্য আয়ের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি স্বচ্ছতার গুরুত্ব
বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে পরপর চুক্তি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতে বাংলাদেশের বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনাবেচার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় বিমানশিল্পের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র খুলেছে।
তবে এসব চুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে উড়োজাহাজের সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কত যাত্রী পরিবহন করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা আর্থিক সুফল দিচ্ছে—তার ভিত্তিতে।
ছয় মাসে ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বড় ধরনের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা। এখন এই পরিকল্পনাকে টেকসই ও লাভজনক বিমান পরিবহনব্যবস্থায় রূপ দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

