বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপ নয়, নিজেদের চিহ্নিত সমস্যার ভিত্তিতেই অর্থনৈতিক সংস্কার: তিতুমীর

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে সংস্কার কর্মসূচিগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং দেশের বিদ্যমান সমস্যা নিজেরাই চিহ্নিত করে নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এ অবস্থান তুলে ধরা হবে। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।

ভঙ্গুর অর্থনীতির তিন প্রধান সংকট

তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। তখন অর্থনীতির তিনটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল—বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আয় মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসা এবং অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হওয়া।

তিনি বলেন, এই তিনটি সংকট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও চিহ্নিত করা হয়েছিল। অতীতে এসব সংস্কার আইএমএফের কর্মসূচির অংশ হিসেবে শর্তযুক্তভাবে এসেছে। তবে এবার সরকার নিজস্ব কৌশল ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো অগ্রাধিকার

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাঁচটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা একসময় নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন। এখন তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে আস্থার পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।

ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের হার ১১ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল ছিল। একই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের (এনবিএল) মতো কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও বা এডিআরও ছিল উচ্চমাত্রায়।

ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্যোগ

ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কমাতে সরকার অভ্যন্তরীণ পদ্ধতিতে সমাধান খুঁজছে বলে জানান তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য, আগে রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংক পরিচালনায় সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো সংস্কার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বন্ধ কলকারখানা চালুতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে অর্থ ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ে ৭ শতাংশ প্রণোদনামূলক সুদে একটি উদ্ভাবনী পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম নেওয়া হয়েছে।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল, নারী উদ্যোক্তা এবং অপেক্ষাকৃত অবহেলিত অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর আশা করছে সরকার।

বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারকে সচল করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

বিনিময় হার স্থিতিশীল, সুদহার কমার প্রত্যাশা

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে সুদের হার কমাবে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়বে এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।

রাজস্ব আদায়ে সংস্কার, ২০৩০ সালে লক্ষ্য ১০ শতাংশ

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা কাটাতেও সরকার সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতিতে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় ছিল তলানিতে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিষয়ে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এর ফলে ৩০ জুনের মধ্যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিতুমীর বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেলেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা মডেলের পরিবর্তন আনছি—উৎপাদন → বিনিয়োগ → উৎপাদন → কর্মসংস্থান।”

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমানোর প্রত্যাশা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সরকার নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে—বিশ্বব্যাংকের এমন হিসাব রয়েছে।

তাঁর মতে, অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তিনটি বড় সমস্যা ছিল। এগুলো হলো—উপযুক্ত ব্যক্তিরা বাদ পড়ে যাওয়া, অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বা খণ্ডবিখণ্ডতা।

এই সমস্যা মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২৩ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে বলে জানান তিনি। ৪০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া গেলে দেশে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ১ শতাংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক পরবর্তী সময়ে নগদ অর্থ সহায়তার কথা বললেও সংস্থাটির প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সরকার ফ্যামিলি কার্ডের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানান অর্থ উপদেষ্টা।

মূল্যস্ফীতিতে বহিঃস্থ কারণের প্রভাব

বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে আগের সরকারের সময়কার স্বজনতোষণ, অলিগার্কি বা দুর্নীতিগ্রস্ত বণ্টন ব্যবস্থার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিতুমীর।

তাঁর মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো বহিঃস্থ বিভিন্ন কারণ মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে।

উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়ছে

বাংলাদেশের প্রতি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়ছে বলেও দাবি করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি জানান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যে গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য ৫০ কোটি ডলার ছাড় করেছে।

এডিবি ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রেসিডেন্ট এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (ইসডিবি) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন বলেও জানান তিনি।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকারীরা কাজ শুরু করেছেন উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, তারা ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানি এবং বিশ্বের বৃহত্তম স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংস্কারে বাংলাদেশের নিজস্ব মালিকানা

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের মূল বার্তা থাকবে—দেশের সংস্কার কর্মসূচিগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং এগুলো নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ।

তিতুমীর বলেন, “আমাদের সংস্কারগুলো বাইরের সংস্থা দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া নয়, এগুলো আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ।”

তিনি জানান, সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দেশের সমস্যাগুলো দেশীয়ভাবে চিহ্নিত করা এবং বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরকারের জনগণের ম্যান্ডেটকে সমন্বয় করে যৌথভাবে কাজ করা।

বহুমুখী হবে অর্থায়নের উৎস

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই বলেও জানান অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দেশের অর্থায়নের উৎস হবে বহুমুখী।

শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে কনসেশনাল ও নন-কনসেশনাল ঋণের পাশাপাশি স্থানীয় বন্ড, সুকুক বন্ড এবং ওয়েজ আর্নার স্কিমের মতো বিভিন্ন উৎসকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিতুমীর বলেন, “আমাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য আনা হবে।”

নিজস্ব সংস্কারেই অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্য

অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগকে গতিশীল করা, বন্ধ কলকারখানা চালু করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করা।

তিতুমীর বলেন, আগের আইএমএফ কর্মসূচিগুলো সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মতো সংস্কারগুলো চিহ্নিত করেছে। এসব উদ্যোগকে তিনি সরকারের ‘অভ্যন্তরীণ’ বা ‘স্বীয় চালিত’ সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন