জাতীয় জলবায়ু নীতি ও পরিকল্পনাকে সমন্বিত কর্মসূচি, মানসম্মত প্রকল্প, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
তিনি বলেন, আজকের উন্নয়ন সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের জলবায়ু ঝুঁকি নির্ধারণ করবে। তাই বড় যেকোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (বিসিডিপি) নলেজ কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ‘বিসিডিপি ওয়েব পোর্টাল’ উদ্বোধন করেন। ডিজিটাল এ পোর্টালের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু সম্পর্কিত প্রকল্প ও বিনিয়োগের তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের পাইপলাইন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়।
মন্ত্রী বলেন, অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আয় সৃষ্টি না করলেও গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণ নিশ্চিত করে। তাই জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং সম্পদের স্বচ্ছ ব্যবহারের পাশাপাশি অভিযোজন ও জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি অব্যাহত রাখতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ফসল উৎপাদন হ্রাস এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি নিম্ন-কার্বন উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক বাস ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিসিডিপির কার্যক্রম আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করতে সহযোগী সংস্থাগুলোর সক্রিয় সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের অভিজ্ঞতা সাহস, উদ্ভাবন ও মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের ফল। তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও মালিকানা, সহজলভ্য ও ন্যায্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বাংলাদেশের আগাম সতর্কীকরণ ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি সম্মেলনের আলোচনাকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার, কার্যকর অংশীদারত্ব ও বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, লাও পিডিআর, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নির্বাহী পরিচালক সত্যা শ্রীনিবাস লোল্লা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। সম্মেলনের সাফল্য পরবর্তী পদক্ষেপ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্মেলনের প্রথম দিনের আলোচনায় জলবায়ু সহনশীলতা ও নিম্ন-কার্বন প্রবৃদ্ধি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। আগামীকাল (৮ অক্টোবর) জ্বালানি রূপান্তর, কম কার্বন নিঃসরণকারী পরিবহন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩–২০৫০ এবং এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে সমন্বয়, অর্থায়ন ও অংশীদারত্ব জোরদার করাও সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন) মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সচিব মুনিরা সুলতানা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এবং এডিবির সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে পাঁচ শতাধিক নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

