দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী বিসামরিক অঞ্চল (ডিএমজেড) এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে সিউল। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী সোমবার জানিয়েছে, জাতিসংঘ কমান্ডের (ইউএনসি) সঙ্গে যৌথ তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মানবঘাতি মাইন থেকেই গত ২১ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণ ঘটে। আহত তিন সেনার মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের (জেসিএস) ভাইস চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কওন দায়-ওন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, নিয়মিত টহলপথ তৈরির কাজের সময় ডিএমজেডে বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের অংশ হিসেবে সামরিক সীমানা রেখার দক্ষিণে পুঁতে রাখা মাইনই এর কারণ।
যৌথ তদন্তে উত্তর কোরিয়ার মাইনের প্রমাণ
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, ২১ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত এবং আহত সেনাদের শরীরে পাওয়া মাইনের অংশবিশেষ উত্তর কোরিয়ার ব্যবহৃত রেজিন-ভিত্তিক অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সামরিক সীমানা রেখার প্রায় ১০ মিটার দক্ষিণে বিস্ফোরণের স্থান ও পরবর্তী সময়ে পাওয়া আরেকটি মাইনের অবস্থানও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, এসব মাইন বন্যার পানিতে ভেসে এসে সেখানে জমা হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং সেগুলো সেখানে পুঁতে রাখা হয়েছিল বলেই তারা মনে করছে।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ কমান্ডও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ তদন্তের পর ডিএমজেডের দক্ষিণ কোরীয় অংশে উত্তর কোরিয়ার একটি সক্রিয় মানবঘাতি মাইন শনাক্ত হওয়ার কথা জানায়। কমান্ডটি ঘটনাটিকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
মাইন সরানোর অভিযান শুরু দক্ষিণ কোরিয়ার
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া নিজ উদ্যোগে মাইন অপসারণ না করলে সিউল তার অংশে মাইন অপসারণের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। সোমবারই বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে মাইন অপসারণের অভিযান শুরু করা হয়েছে।
কওন দায়-ওন উত্তর কোরিয়ার প্রতি আহত সেনাদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে পুঁতে রাখা মাইন দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া স্বেচ্ছায় ব্যবস্থা না নিলে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী নিজেদের উদ্যোগে মাইন অপসারণ অব্যাহত রাখবে।
সীমান্তে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা জোরদার
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর দাবি, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে উত্তর কোরিয়া আন্তঃকোরীয় সীমান্তে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো জোরদার করছে। মাইন পাতা, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং অ্যান্টি-ট্যাংক বাধা তৈরির মতো কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চলতি বছর প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক মোতায়েন করা হয়েছে বলে সিউল জানিয়েছে। এ সময় সীমান্ত অতিক্রমের প্রায় ৫০টি ঘটনাও ঘটেছে বলে সামরিক বাহিনীর ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষ্য, উত্তর কোরিয়ার এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ডিএমজেড এলাকায় উত্তেজনা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে নতুন করে মাইন পাতা হলে নিয়মিত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনাকারী সেনাদের জন্য ঝুঁকি বাড়ে।
অভিযোগ অস্বীকার উত্তর কোরিয়ার
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং সিউলের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এর আগে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সীমান্তে তাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পিয়ংইয়ং আরও সতর্ক করেছে, সীমান্তে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের লক্ষ্য করে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী গুলি চালালে এর জবাব দেওয়া হবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘিরে নতুন উত্তেজনা
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়নি; বরং যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত বন্ধ হয়। ফলে দুই কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। প্রায় ৪ কিলোমিটার প্রশস্ত ও ২৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডিএমজেড দুই দেশের মধ্যে একটি সামরিক বাফার অঞ্চল হিসেবে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ কমান্ডের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মাইন অপসারণ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও মাইন অপসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া অভিযোগ অস্বীকার করছে। ফলে ঘটনাটির পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দুই কোরিয়ার সামরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

