মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অভিযোগের জবাব দিল এনপিসিবিএল

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও কমিশনিং পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)-এর ১৬ মেগাপাসকেল (এমপিএ) চাপের পরীক্ষা সফল হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও গত শনিবার দেশে পৌঁছেছে।

এমন সময়ে প্রকল্পের ব্যয়, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, জনবল ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও নেতিবাচক প্রচারণা সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।

সোমবার সকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া অভিযোগ প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবমূর্তির পাশাপাশি প্রকল্পে কর্মরত প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তার দাবি, বিভিন্ন প্রচারণায় অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে যথাযথ পার্থক্য করা হয়নি।

কমিশনিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

এনপিসিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এর অংশ হিসেবে পিওআরভি/পিওএসভির ১৬ এমপিএ চাপের পরীক্ষা সফল হয়েছে।

এ ছাড়া দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও বাংলাদেশে পৌঁছেছে। ফলে দুই ইউনিটের কমিশনিং ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

প্রকল্পটি দেশের প্রথম ও অন্যতম বৃহৎ ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প হওয়ায় এর নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালন সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একাধিক পদে আলাদা বেতন নেওয়ার অভিযোগ নাকচ

এনপিসিবিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান তার দায়িত্ব ও পারিশ্রমিক নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে তাকে উচ্চতর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে তিনি এনপিসিবিএলের পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এ পদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।

একই সময়ে একাধিক পদের জন্য আলাদা বেতন নেওয়ার যে অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, এ ধরনের ব্যবস্থা সরকারি নীতিমালারও পরিপন্থি।

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কমিটি

প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একক ক্ষমতার বিষয়টি নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনপিসিবিএল এমডি।

তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট কমিটি ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া হয়। শপ ম্যানেজার ও ডেপুটি শপ ম্যানেজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তও ক্ষমতাপ্রাপ্ত বোর্ড কমিটির মাধ্যমে নেওয়া হয়।

তার দাবি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এককভাবে এসব পদে কাউকে নিয়োগ বা দায়িত্ব দিতে পারেন না। ফলে বিদ্যমান কর্মীদের উচ্চতর দায়িত্ব অর্পণকে ব্যক্তিগত নিয়োগ বা একক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১ হাজার ৯২২ জন নিয়োগ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ৯৯৭ জনের

রূপপুর প্রকল্পের জনবল ও প্রশিক্ষণ নিয়েও বিভিন্ন তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে এনপিসিবিএল।

ড. জাহেদুল হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনপিসিবিএলে মোট ১ হাজার ৯২২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৯৯৭ জন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৭ জন প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন, যা মোট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে গ্রেড ১৬ থেকে ১৯-এর প্রায় ১০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠানত্যাগকে বিশেষায়িত পারমাণবিক জনবলের প্রস্থান হিসেবে দেখানো ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।

তার ভাষ্য, ওই কর্মীদের মধ্যে অ্যাটেনডেন্ট, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত ব্যক্তিরা ছিলেন। তাই মোট কর্মীপ্রস্থান এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রতিষ্ঠানত্যাগ পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কমিশনিংয়ে বিএইসি ও এনপিসিবিএলের দায়িত্ব আলাদা

রূপপুরের কমিশনিং কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ক্ষেত্রেও দায়িত্বের বিভাজন তুলে ধরেছেন এনপিসিবিএল এমডি।

তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি)। অন্যদিকে, এনপিসিবিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশন হিসেবে কাজ করছে।

ফলে কমিশনিং-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা কোনো বিলম্বকে সরাসরি এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয় বলে দাবি করেন তিনি।

রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের আবাসন নিয়েও ব্যাখ্যা

রাশিয়ায় অবস্থানরত কর্মকর্তাদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ড. জাহেদুল হাসান।

তার দাবি, কর্মকর্তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়নি। তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাশিয়ায় অবস্থানরত পরিদর্শকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি জানান, অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে প্রকল্পের জেনারেল কন্ট্রাক্টর জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (এএসই)। বিভিন্ন সময়ে মোট ৪১ জন কর্মকর্তা এসব অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন এবং তাদের জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছিল। একই সময়ে তারা হোটেল ভাতা নেননি বলেও জানান তিনি।

৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অমূলক দাবি

রাশিয়ায় বাসা ভাড়ার জন্য ৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে অমূলক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন এনপিসিবিএল এমডি।

তার বক্তব্য, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী অডিট বিবেচনায় না নিয়ে এ দায় ব্যক্তিগতভাবে তার ওপর চাপানো তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

তিনি জানান, বিষয়টি পরে ছয় সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট দলের মাধ্যমে পরিদর্শন করা হয়। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। বাংলাদেশ দূতাবাসের রাশিয়াস্থ দুই কর্মকর্তাও অডিট কার্যক্রমে অংশ নেন।

অডিট প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, রূপপুর বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অফিস আদেশ, পরিচালনা পর্ষদ ও কমিটির সিদ্ধান্ত, সরকারি আদেশ, অডিট প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হলে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটির পারমাণবিক নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, কমিশনিং কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য যাচাই, প্রাতিষ্ঠানিক নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন