রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

নামাজের ইমামতির মতো সমাজের দায়িত্বও নিতে হবে আলেমদের: শফিকুর রহমান

মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত; নুরুল আমিন সভাপতি, নাসির উদ্দিন হেলালী সেক্রেটারি

আলেমদের শুধু মসজিদের মিম্বার ও নামাজের ইমামতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, “আলেমদের শুধু মিম্বারের দায়িত্ব নিলেই চলবে না। নামাজের ইমামতির পাশাপাশি সমাজের ইমামতির দায়িত্বও নিতে হবে।”

শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন আয়োজিত জাতীয় কাউন্সিল ও মুফাসসির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুগে যুগে জাতি যখন পথ হারিয়েছে, তখন আলেম-ওলামারা জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। বর্তমান সময়েও তাদের সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে কাউকে তিরস্কার বা আঘাত করে নয়, বরং ভালোবাসা, জ্ঞান, আমল ও যুক্তির মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে হবে।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। দেশ মোটেই ভালো নেই। মানুষ বড় কষ্টে আছে। শুধু খাওয়া-পরার দিক থেকেই নয়, ইজ্জত ও জীবনের নিরাপত্তার দিক থেকেও মানুষ কষ্টে রয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সমাজের অসঙ্গতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আলেমদের দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

‘ওহির ওপর হাত দেওয়ার এখতিয়ার কোনো মানুষের নেই’

জাতীয় সংসদে কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী আইন পাস হয়েছে বলে দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ দেশের আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও পরিবর্তন করতে পারে। তবে ধর্মীয় বিধানের ক্ষেত্রে আল্লাহর ওহির ওপর হস্তক্ষেপের অধিকার মানুষের নেই।

তিনি বলেন, “আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেওয়ার এখতিয়ার কোনো মাখলুকের থাকতে পারে না। যখনই আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেওয়া হয়েছে, তখনই দুনিয়া হেদায়েত ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।”

কোরআনের সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এমন একটি কিতাব, যার হরফ ও হরকতে পরিবর্তন হয়নি এবং মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী কিয়ামত পর্যন্ত তা সংরক্ষিত থাকবে।

সংসদে পাস হওয়া যে আইনকে তিনি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, বক্তব্যে সেটির নাম স্পষ্ট করেননি। তিনি আলেমদের এ ধরনের বিষয়ে গঠনমূলকভাবে কথা বলা এবং সংশোধনের লক্ষ্যে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

‘দু-একজনের ভুলে পুরো আলেম সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট যেন না হয়’

আলেম সমাজের নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়েও সতর্ক থাকার তাগিদ দেন জামায়াত আমির।

তিনি বলেন, দু-একজনের ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে যেন পুরো আলেম সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি সাদা কাপড়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কালো কাপড়ে ছোট দাগ সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু সাদা কাপড়ে সামান্য দাগও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই ধর্মীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য এবং ব্যক্তিগত চরিত্রের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পথভোলা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দয়া, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার আদর্শ অনুসরণ করা প্রয়োজন।

‘কাউকে আঘাত করে কথা বলা যাবে না’

সম্মেলনে উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের যাত্রা শুরু হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে এ ধরনের জাতীয় কাউন্সিল ও সম্মেলন প্রকাশ্যে করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মুফাসসিরদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বক্তব্য দেওয়ার সময় উম্মাহর ঐক্য, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীকে আঘাত করে বক্তব্য না দিয়ে সত্য ও সঠিক বিষয় হিকমা এবং যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, মুফাসসিররা বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা ও সংগঠিত করতে মাজলিসুল মুফাসসিরীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নুরুল আমিন সভাপতি, নাসির উদ্দিন হেলালী সেক্রেটারি

এর আগে সকাল ৯টায় আইডিইবি ভবনে সংগঠনের বিদায়ী সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

কাউন্সিলে আগামী তিন বছরের জন্য ২০২৬-২০২৮ মেয়াদে সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনকে সভাপতি এবং মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীকে সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। সাভারের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আযহারীকে সাংগঠনিক সেক্রেটারি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ২৫ সদস্যের কার্যকরী পরিষদ এবং ১০১ সদস্যের জাতীয় পরিষদ গঠন করা হয়।

জাতীয় কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকী, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসাঈন ও ড. মীম আতিকুল্লাহ।

নবনির্বাচিত সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে এবং নবনিযুক্ত সেক্রেটারি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীর পরিচালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন মাওলানা আবদুল হালিম, ড. খলিলুর রহমান মাদানী, ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকী, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা কে এম আবদুস সোবাহান, ড. বি এম মফিজুর রহমান আজহারী ও ড. ফয়জুল হকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমরা।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় কাউন্সিল ও সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক মুফাসসির, মুহাদ্দিস, মুফতি, মাদরাসার অধ্যক্ষ ও আলেম অংশ নেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন