‘প্লিজ কোনো টেনশন নেবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ’—সালমান • ‘দেশে কি কোনো সরকার আছে?’—আসিফ মাহমুদ • নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রশ্ন, ‘পরিবর্তনের অর্থ কী?’ • পুলিশ বলছে নেপথ্যে জমিসংক্রান্ত বিরোধ • আটক ৩
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেতা সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর সালমান সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাসহ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিও ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তবে হামলার কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সালমান ও নিউ গিনি প্রোপার্টিজের সংশ্লিষ্টরা চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ তুললেও পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য—জায়গা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং সালমানের স্টুডিও হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল না।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই প্রকল্পেই সালমানের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও অবস্থিত।
স্টুডিওর একজন কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন লোক এসে প্রথমে শাটারে কোপাতে শুরু করে। পরে তারা ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই কর্মীর অভিযোগ, হামলাকারীদের কারও কারও হাতে চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। আতঙ্কে স্টুডিওর কর্মীরা ওয়াশরুমে লুকিয়েও রক্ষা পাননি; তাদের ফোন ও মানিব্যাগও নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পর প্রকাশিত ভিডিওতে চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ স্টুডিওর বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ভাঙচুর অবস্থায় দেখা যায়। সালমান জানান, হামলায় তার কোনো কর্মী শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সালমান: ‘প্লিজ কোনো টেনশন নেবেন না’
হামলার পর সালমানের সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্য আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে।
ভাঙচুর হওয়া স্টুডিও থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘এই ভিডিওটা খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।’
সালমানের বক্তব্যের ভঙ্গি ছিল স্পষ্টতই ব্যঙ্গাত্মক। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাইলে এবং কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী না হলে কিংবা প্রভাবশালী ‘ব্যাকআপ’ না থাকলে নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন সালমান। তবে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি তার ব্যক্তিগত কোনো রাগ, অভিযোগ বা দাবি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কী করা প্রয়োজন, তা মন্ত্রী নিজেই জানেন—এমন মন্তব্য করে তার কাজের মূল্যায়ন দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দেন সালমান।
‘এটা শুধু ভাঙচুর নয়’
সালমান ঘটনাটিকে সাধারণ ভাঙচুর হিসেবে দেখছেন না। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার দৃষ্টিতে এটি ‘রবারি, চাঁদাবাজি’ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা।
তিনি বলেন, স্টুডিওতে ৩০ থেকে ৪০ জন ক্লায়েন্টের বিভিন্ন সামগ্রী ছিল। হামলাকারীরা হার্ডডিস্ক, ফোন, টাকা ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে ক্ষতির মোট আর্থিক পরিমাণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
সালমান একই সঙ্গে পরিষ্কার করেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি। তার ধারণা, আবাসন প্রকল্প বা জমির মালিকের সঙ্গে চাঁদা বা জমি নিয়ে কোনো বিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার স্টুডিওও হামলার মধ্যে পড়ে।
বিএনপির লোকজন জড়িত বলে সালমানের অভিযোগ
সালমান তার বক্তব্যে বিএনপির লোকজন হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি তাদের উদ্দেশ করে বলেন, চাঁদাবাজি তার স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারবে না এবং ধ্বংস হওয়া প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বড় কিছু তিনি আবার গড়ে তুলবেন।
তবে এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশও প্রাথমিক তদন্তে কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেনি। ফলে এটি সালমানের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
সালমানের অভিযোগ নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালমানের বক্তব্যের পর রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সালমান ফেসবুক লাইভে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সালমান একদিকে বলেছেন তার কাছে কেউ চাঁদা চায়নি, অন্যদিকে বিএনপিকে নিয়ে ঢালাও চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন—এ ধরনের সাধারণীকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
নিজের দিকে আঙুল তোলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও বাক্স্বাধীনতার কারণে সালমান তাকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দিতেই পারেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে; তবে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।
পুলিশ বলছে, নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ
সালমান ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ভিন্ন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাজমুল হক জানিয়েছেন, জায়গা নিয়ে বিরোধের কারণে একটি পক্ষ রাতে জায়গাটি দখল করতে যায়। এ সময় সেখানে ভাড়া নিয়ে পরিচালিত সালমানের স্টুডিওটিও ভাঙচুরের শিকার হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমানের স্টুডিও হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল না।
এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করার তথ্য পাওয়া গেছে। হামলায় অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
‘দেশে কি কোনো সরকার আছে?’—আসিফ মাহমুদ
হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘দেশে কি কোনো সরকার আছে?’
আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেওয়ার কারণে ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
তার বক্তব্যে মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী: ‘তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী?’
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের কঠিন সময়ে যখন অনেকে নীরব ছিলেন, তখন সালমান মুক্তাদির প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আহতদের চিকিৎসা ও আশ্রয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও একজন নাগরিককে যদি চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ভয় নিয়ে চলতে হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী—এমন প্রশ্ন তোলেন পাটওয়ারী। তিনি হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সাদিক কায়েমেরও প্রতিবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমও ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি হামলাকে চাঁদাবাজি ও দখলদারির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।
সাদিক কায়েম তার বক্তব্যে বিএনপির লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে তার এই রাজনৈতিক অভিযোগও তদন্তে এখনো প্রমাণিত হয়নি।
ক্ষুব্ধ সাদিয়া আয়মান
অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানও সালমানের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ঘটনাটিকে ‘হৃদয়বিদারক’ ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনয়শিল্পী ও সাধারণ মানুষ হামলা-ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিচারের দাবি তুলেছেন।
সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ঘটনাটিকে ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—এতসংখ্যক হামলাকারী কার নির্দেশে সেখানে গিয়েছিল, তাদের মূল লক্ষ্য কী ছিল, অস্ত্র ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ কতটা সত্য, লুট হওয়া সম্পদের পরিমাণ কত এবং হামলায় কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না।
একদিকে সালমান ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ তোলা হচ্ছে; এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিও সেই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, ঘটনার সূত্রপাত জমিসংক্রান্ত বিরোধ থেকে।
সালমানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তীব্র ও ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য এবং এর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাটি এখন শুধু একটি স্টুডিওতে হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধের অভিযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
হামলার প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী ও অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।

