খেয়াঘাট আছে, নৌকাও আছে। কিন্তু ঘাটে পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথ নেই। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় সংযোগ সড়ক, আর ভাটার সময় সেখানে জমে থাকে হাঁটুসমান কাদা। বাধ্য হয়ে কাদা মাড়িয়েই খেয়ায় উঠতে হয় কয়েক গ্রামের শত শত মানুষকে। কখনো আবার অন্যের বাড়ি বা জমির ওপর দিয়ে ঘুরে ঘাটে পৌঁছাতে হয়।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মাঝের খেয়াঘাট ব্যবহারকারী মানুষদের বছরের প্রায় সাত মাস ধরে এভাবেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে একই পরিস্থিতি চললেও সংযোগ সড়কটি স্থায়ীভাবে সংস্কার বা উঁচু করার উদ্যোগ না নেওয়ায় ভোগান্তি কমছে না।
স্থানীয়রা জানান, মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের মিঠাগঞ্জ গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের জন্য মাঝের খেয়াঘাটটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কৃষক, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন এ ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। বর্ষা মৌসুম ও জোয়ারের সময় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
জোয়ারের পানি বাড়লে ঘাটের সংযোগ পথ ডুবে যায়। তখন পায়ে হেঁটে যাওয়ারও সুযোগ থাকে না। আবার পানি নেমে গেলে পুরো পথ কাদায় পরিণত হয়। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে থাকায় পা আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ কিংবা স্থানীয়দের বাড়ির ওপর দিয়ে ঘুরে ঘাটে পৌঁছান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টিয়াখালী ইউনিয়নের অংশে সমস্যাটি বেশি প্রকট। অপর প্রান্তে মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের অংশ তুলনামূলক ভালো হলেও বৃষ্টির সময় সেখানেও যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ভাটার সময় কাদা মাড়িয়ে খেয়ায় ওঠা যাত্রীদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
টিয়াখালী ইউনিয়নের খেয়াঘাট এলাকার দোকানদার আব্দুর রহমান সিকদার বলেন, ‘জোয়ারের সময় এই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই রাস্তার এমন অবস্থা দেখে আসছি। অথচ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এই পথ ব্যবহার করেন। রাস্তা উঁচু করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে।’
মিঠাগঞ্জ বড় জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মো. নেছার উদ্দিন বলেন, ‘জোয়ারের সময় খেয়া পার হতে হলে কাপড় অনেক ওপরে তুলতে হয়। নারীদের জন্য বিষয়টি বিব্রতকর। আবার ভাটায় হাঁটুসমান কাদা পেরিয়ে ঘাটে উঠতে হয়।’
খেয়াযাত্রী মো. হানিফ সিকদার বলেন, ‘দুই পাড়েই সমস্যা রয়েছে। তবে উত্তর পাড়ের অবস্থা বেশি খারাপ। বেড়িবাঁধ থেকে খেয়াঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি উঁচু করে নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে।’
খেয়াঘাটের মাঝি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জোয়ারে ঘাটে আসার পথ পানিতে ভরে যায়, আর ভাটায় হাঁটুসমান কাদা থাকে। এ কারণে মানুষজন ঠিকমতো চলাচল করতে পারেন না। অনেক সময় যাত্রী না থাকায় সারাদিন বসে থাকতে হয়।
মিঠাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপা সিকদার বলেন, তিন বছর ধরে তিনি এখানে চাকরি করছেন। কলাপাড়া শহর থেকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের দুর্ভোগ বেশি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কলাপাড়া শহর থেকে আসেন। এ ছাড়া এলাকায় দুটি মাদ্রাসা ও একটি উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষককেও এই খেয়া ব্যবহার করতে হয়। সংযোগ সড়ক উঁচু করা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিষয়টি সমাধানের জন্য কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জোয়ারে পানি বেড়ে গেলে খেয়াঘাটের সংযোগ সড়কটি তলিয়ে যায় এবং ভাটায় সেখানে কাদা জমে। সংযোগ সড়কটি মাটি দিয়ে উঁচু করা প্রয়োজন। বিষয়টি অর্থায়নের জন্য আগামী উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় উত্থাপন করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, খেয়াঘাটের দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক উঁচু করে টেকসইভাবে নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে কয়েক গ্রামের মানুষ মুক্তি পাবে।

