জামায়াত বিট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় • সংসদে বিরোধীদের বক্তব্য উপেক্ষার অভিযোগ • জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা • জনদাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সাংবাদিকরা ভালো থাকলে দেশও ভালো থাকবে। সত্য ও অসত্যের পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য ও জনদুর্ভোগ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, তৈরি পোশাক খাত এবং বিরোধী দলের চলমান লংমার্চ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
‘গণমাধ্যম শক্তিশালী থাকলে দেশ ভালো থাকবে’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই স্তম্ভ শক্তিশালী থাকা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে।”
সাংবাদিকদের ‘কালোকে কালো এবং সাদাকে সাদা’ বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণমাধ্যম শক্তিশালী থাকলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মতবিনিময়ে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের বিভিন্ন পেশাগত সমস্যার কথাও জানতে চান তিনি। সাংবাদিকদের কোনো সংগঠন বা কাঠামোর মাধ্যমে সমস্যাগুলো ও সম্ভাব্য সমাধানের প্রস্তাব লিখিতভাবে জানানো হলে সেগুলো নিয়ে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।
সংসদে বিরোধীদের বক্তব্য গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দল গঠনমূলক পরামর্শ ও নোটিশ দিলেও সরকার তার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতিতে যেতে চায় না। বরং সংসদের ভেতরে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে।
তবে সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনার সুযোগ না পাওয়ার কারণেই বিরোধী দলকে জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে যেতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সরকারের সমালোচনা
সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিরও সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের দামেও প্রভাব পড়ে।
জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মূল্য তুলনা করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতির আকার, মানুষের আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে বিরোধী দলের পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দাবি না মানলে আন্দোলন চলবে
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দল জনগণের বিভিন্ন দাবি সরকারের সামনে তুলে ধরছে। সরকার এসব দাবি বিবেচনায় না নিলে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের বিষয়েও সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বেড়েছে।
লংমার্চ নিয়ে যা বললেন শফিকুর রহমান
বিরোধী দলের চলমান লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন জামায়াত আমীর।
তিনি বলেন, কয়েকশ গাড়ি নিয়ে প্রতীকীভাবে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এর চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন নিয়ে কর্মসূচি করার সাংগঠনিক সক্ষমতা থাকলেও জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তা করা হয়নি।
লংমার্চে উত্থাপিত দাবিগুলো কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক দাবি নয়, বরং জনগণের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—এমন দাবি করেন তিনি।
কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের সাময়িক কষ্ট বা ভোগান্তি হয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখও প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ঢাকা-রংপুর লংমার্চের আগে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়েও মতবিনিময় সভায় কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। উল্টো সরকারি দলের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ লংমার্চ বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ওই ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ করেন জামায়াত আমীর।
তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ; মতবিনিময় সভায় এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক রাখার নীতি রয়েছে এবং ভবিষ্যতের কর্মসূচিও একইভাবে পরিচালনার চেষ্টা থাকবে।
মতবিনিময়ে ছিলেন যারা
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এ সময় নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালসহ দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আব্দুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন ডা. শফিকুর রহমান।

