বরগুনার বেতাগীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নেছার উদ্দিন খানের চাঁদা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে টাকা চাওয়ার মতো কথোপকথন শোনা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রোববার রাতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার ধারণ করা ওই ভিডিওর কথোপকথনের সব অংশ স্পষ্ট নয়। তবে সেখানে নেছার উদ্দিন খানের কণ্ঠসদৃশ একটি কণ্ঠে ‘আজকে যা পারো দিয়ে দেও’—এমন কথা শোনা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জবাবে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে ‘টাকা নাই, টাকা নাই’ বলতে শোনা যায়।
তবে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির সত্যতা, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং কথোপকথনের প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে টোল আদায়, সরকারি জমি দখল, হুমকি-ধমকি, মামলা এবং দলীয় কমিটি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বেতাগী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের একটি চাঁদাবাজির মামলায় নেছার উদ্দিন খানকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হলে বরগুনার দ্রুত বিচার আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ বেতাগী পৌর টেম্পু স্ট্যান্ডের তালিকাভুক্ত ইজারাদার ও বাসস্ট্যান্ডের তৌহিদ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলাদারের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ইজারা বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে। পরে ১৪ এপ্রিল বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন সড়কে ভুয়া রশিদ তৈরি করে যানবাহন থেকে অবৈধভাবে পৌর টোল আদায়ের অভিযোগও করা হয়।
খোকন হাওলাদার বিষয়টি পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে টোল আদায় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপরও তা অব্যাহত রাখার অভিযোগে তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। ওই মামলায় নেছার উদ্দিন খান আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই বেতাগী পৌর শহরে সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে ঘর নির্মাণের অভিযোগে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে স্থাপনাটি ভেঙে দেয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ করা হয়েছে। বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. বজলুর রহমান তার বিরুদ্ধে ১০টি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলেও দাবি করেন।
এদিকে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। নোটিশে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জেলা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতার অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের নামে অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্য, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্নভাবে হয়রানি বা চাপের মুখে পড়তে হয়। তবে এসব অভিযোগও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হিন্দু পরিবারকে লক্ষ্য করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদা দাবির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে দলীয় পদ ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে বিএনপির সাবেক উপজেলা আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র শাহজাহান কবির বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. নেছার উদ্দিন খান। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও সম্পর্কে বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশিদ হাওলাদার বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নেছার খানের চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি তার নজরে আসেনি। এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগও করেননি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বিষয়ে তার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তবে মৌখিকভাবে অভিযোগের কথা শুনেছেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের বিষয়টিও তার নজরে আসেনি বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী।

