দেশ ও কর্মীদের কর্মসংস্থানের স্বার্থে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যরা। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন তারা।
তাদের দাবি, সময়মতো বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো সম্ভব না হলে মালয়েশিয়া সরকার অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করবে। এতে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় এ শ্রমবাজারের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণ, সঠিক তথ্য উপস্থাপন ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে’ বায়রা সদস্যদের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বায়রার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগের ফলে মালয়েশিয়া থেকে পাওয়া রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তার দাবি, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে কর্মীদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে মালয়েশিয়া সরকারের তালিকাভুক্ত নয়—এমন কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি সভা, মিছিল, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করার পরও প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি মানবপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মতো মামলা-মোকদ্দমার মাধ্যমে শ্রমবাজার উন্মুক্তের প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করছে।
বায়রার লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন না থাকা কিছু এজেন্সি ‘ডামি ডিমান্ড লেটার’-এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত এজেন্সির নামে ব্যবসা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজশে অভিবাসন ব্যয় বেড়েছে এবং এতে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে অধিকসংখ্যক কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি কর্মীদের ন্যূনতম মূল বেতন ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত নির্ধারণ করেছে। বেতন, ভাতা ও ওভারটাইম মিলিয়ে একজন কর্মী মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন বলে দাবি করেন বক্তারা। এ কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগ্রহ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মালয়েশিয়া সরকারের ইকোনমিক প্ল্যানিং ইউনিট নির্ধারিত ২৫ লাখ বিদেশি কর্মীর সীমা অতিক্রম করায় ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ সব সোর্স কান্ট্রি থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয় দেশটি। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে পুনরায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বায়রার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মালয়েশিয়ার এই সিদ্ধান্তের পর নেপাল ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন সোর্স কান্ট্রি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী পাঠানো শুরু করলেও বাংলাদেশ সে সুযোগ যথাসময়ে কাজে লাগাতে পারেনি। তাদের ভাষ্য, একই সময়ে বাংলাদেশ কর্মী পাঠানো শুরু করতে পারলে এ পর্যন্ত অন্তত এক লাখ কর্মীর মালয়েশিয়ায় অভিবাসন সম্পন্ন হতে পারত।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর মালয়েশিয়া সরকার নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী বাংলাদেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠায়।
বক্তারা জানান, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতোশ্রী আনোয়ার বিন ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে তাগিদ দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
বায়রার দাবি, পরবর্তীতে মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে বোয়েসেলসহ ২৬টি মূল এজেন্সি এবং সহযোগী হিসেবে ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এসব এজেন্সির মধ্যে কর্মী নিয়োগের জন্য কোটা বরাদ্দের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বরাদ্দ করা কোটার কর্মীদের জন্য অনলাইনে ই-এম্বাসি সফটওয়্যার মডিউলে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অ্যাটেস্টেশনসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বায়রার নেতারা অভিযোগ করেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর বায়রার কিছু সদস্য এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগী গণমাধ্যম এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করছেন। পাশাপাশি আন্দোলন, সভা-মিছিল ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমবাজারটি আবারও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসায় মালয়েশিয়ার বাজারটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বক্তারা বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর উচিত নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি দেশের স্বার্থ ও কর্মীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে দেশটির সরকার অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ করে চাহিদা পূরণ করতে পারে। এতে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আল আকাবা অ্যাসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান বিশ্বাস। এ সময় বায়রার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।

