বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানির আগুনে পুড়ছে সিরিয়া, ‘মানুষের হাতে টাকা নেই’

ডিজেলের দাম এক লাফে ৪০ শতাংশ • পেট্রল বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ • পরিবহন-খাদ্যে বাড়ছে খরচ • রাস্তায় বিক্ষোভ • প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই সিরিয়ার সাধারণ মানুষের ওপর নতুন আঘাত হয়ে এসেছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। ডিজেলের দাম এক লাফে ৪০ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। এর ধাক্কা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পরিবহন, কৃষি, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারে। ক্ষোভে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ।

অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা ফুটে উঠছে সিরীয়দের একটি কথায় ‘মানুষের হাতে টাকা নেই।’

নতুন মূল্যতালিকায় ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১২৫ থেকে বেড়ে ১৭৫ সিরীয় পাউন্ড হয়েছে। ৯৫ অকটেন পেট্রল ১৫২ থেকে ১৯৫ পাউন্ড এবং ৯০ অকটেন পেট্রল ১৪৭ থেকে ১৮৫ পাউন্ডে উঠেছে।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি।

জ্বালানির ধাক্কা এখন খাবারের বাজারে

সিরিয়ায় ডিজেল শুধু পরিবহনের জ্বালানি নয়। কৃষিকাজ, সেচ, ট্রাক্টর, পণ্য পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম ৪০ শতাংশ বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

কয়েকটি এলাকায় এরই মধ্যে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। কৃষকদের জন্যও বেড়েছে সেচ ও উৎপাদন খরচ।

অথচ দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। দীর্ঘ যুদ্ধ, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতিতে বহু পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা আগেই তলানিতে নেমেছে।

রাস্তায় ক্ষোভ, ট্যাংকার অবরোধ

মূল্যবৃদ্ধির পর আলেপ্পো, ইদলিব, রাক্কা ও হাসাকাহসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে, কোথাও আটকে দেওয়া হয়েছে জ্বালানিবাহী ট্যাংকার।

দামেস্ক ও আলেপ্পোর সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ M5 মহাসড়কের কিছু অংশেও বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে। কয়েকটি বিক্ষোভ থেকে জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

রয়টার্সের হিসাবে, বাশার আল-আসাদের পতনের পর অর্থনৈতিক ইস্যুতে এটি সিরিয়ার সবচেয়ে বিস্তৃত বিক্ষোভগুলোর একটি।

‘রুটি কেনাও কঠিন’

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের বক্তব্যে উঠে এসেছে সংকটের ভয়াবহতা। উত্তর সিরিয়ার আজাজের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রুটি কেনার সামর্থ্য ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, মানুষ এখন প্রতিদিন সকালে নতুন কোনো মূল্যবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের আশঙ্কা নিয়ে ঘুম থেকে উঠছে।

কেন বাড়ল দাম

সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, মূল্যবৃদ্ধি ‘সাময়িক’। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন, শিপিং ও বীমার ব্যয় বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বানিয়াস তেল শোধনাগারের সংস্কার। প্রায় দুই মাসের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে অভ্যন্তরীণ পরিশোধন কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে বেশি জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।

দেশটির প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য প্রয়োজন। বিপরীতে স্থানীয় অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ব্যারেল।

ডিজেলের সংকট আরও প্রকট। দৈনিক প্রায় ৭৭ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় প্রায় ৩১ লাখ লিটার। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ ডিজেলই আমদানি করতে হচ্ছে।

নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা

বাশার আল-আসাদের পতনের পর আহমেদ আল-শারার সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে সচল করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানো। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

৫০ জনের বেশি আইনপ্রণেতা মূল্যবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগেও স্বাক্ষর করেছেন।

সরকারের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ—আমদানির বাড়তি ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে, নাকি ভোক্তার ওপর চাপাবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন