শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছয় বিল পাস, ৯ বৈঠক শেষে ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপ্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও সম্পত্তি হস্তান্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বিল পাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। গত ২৭ আগস্ট শুরু হওয়া এ অধিবেশনে মোট নয়টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনা ছিল এবারের অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য দিক।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের উপস্থিতিতে অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। পরে তিনি অধিবেশন সমাপ্তিসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আদেশ পাঠ করেন।

পাস হয়েছে ছয় গুরুত্বপূর্ণ বিল

তৃতীয় অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপনের পাশাপাশি ছয়টি বিল পাস হয়েছে। এগুলো হলো—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬; সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬।

এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইন দুটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

অধিবেশন চলাকালে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়। পাশাপাশি একটি বিশেষ কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিয়েছেন ১৫ প্রশ্নের

স্পিকার জানান, অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যদের করা ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা উত্তর দিয়েছেন আরও ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের।

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির আওতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সদস্যদের দেওয়া নোটিশ নিয়েও অধিবেশনে আলোচনা হয়েছে।

বিধি ৬৮-এর আওতায় সাতটি নোটিশ জমা পড়ে। এর মধ্যে দুটি গ্রহণ করে আলোচনা করা হয়। বিধি ৭১-এর আওতায় গ্রহণ করা হয় ১৫টি নোটিশ, যার মধ্যে ১৪টি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া দুই মিনিটের বক্তব্যের জন্য বিধি ৭১(ক)-এর আওতায় ১২৪টি নোটিশ পাওয়া যায়। বিধি ১৪৭-এর আওতায় দুটি এবং বিধি ৩০২-এর আওতায় একটি নোটিশ উত্থাপিত হয়।

‘সৌরবিদ্যুতের উৎপাদক হব আমরা’

সমাপনী দিনে সংসদে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, বিদ্যমান সংকট শিগগিরই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

তারেক রহমান জানান, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।

তিনি বলেন, এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ভোক্তা ছিল। সরকারের সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদক হয়ে উঠবে।

বাক্‌স্বাধীনতার সঙ্গে শালীনতার আহ্বান

সংসদে ও রাজনৈতিক পরিসরে অশালীন ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও অবাধ বাক্‌স্বাধীনতা রয়েছে। তবে বাক্‌স্বাধীনতার চর্চা যেন শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও সংসদীয় বিতর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় মতপার্থক্য স্বাভাবিক। তবে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের রাজনৈতিক ও সংসদীয় চর্চা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

স্পিকার আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ অধিবেশনগুলোতেও সংসদ সদস্যরা সংসদীয় বিধি, রীতি ও প্রথা অনুসরণ করবেন এবং দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।

অধিবেশন পরিচালনায় সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রিসভার সদস্য, সরকারি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান স্পিকার।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে বাবা-মায়ের সুরক্ষা

এদিকে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অধিবেশনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি।

সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ আইনের মাধ্যমে বয়স্ক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।

চিফ হুইপের মতে, সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মা যাতে অসহায় হয়ে না পড়েন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এ বিধান রাখা হয়েছে।

গুম ও মানবাধিকার আইনে অংশীজনের মতামত

গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন নিয়েও কথা বলেন নুরুল ইসলাম মনি।

তিনি জানান, এসব আইন প্রণয়নের আগে বিদেশি রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে। আইনজীবী, বিচারক ও সাংবাদিকদের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব

সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টিতে তিনজন করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাখা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সরকার ও বিরোধী দলের সংসদীয় সম্পর্ক প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়নি; বরং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে নয় কার্যদিবসের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রম শেষ হয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন