বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারীর বিরুদ্ধে এআই-নির্ভর অনলাইন সহিংসতা ঠেকাতে ‘ঢাকা ডায়ালগ’ উদ্যোগ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠক

অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড প্রণয়ন, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের অনলাইনে হয়রানি, মানহানি ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে সরকারের নেতৃত্বাধীন ‘ঢাকা ডায়ালগ’ প্ল্যাটফর্মকে এগিয়ে নিতে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে এআই-নির্ভর ডিজিটাল সহিংসতা মোকাবিলায় আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড তৈরি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

‘ঢাকা ডায়ালগ’ উদ্যোগটি গত ২০ এপ্রিল আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত দশম ডাকার ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম অন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিতে বাংলাদেশ উপস্থাপন করে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এআই-সহায়িত অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংজ্ঞা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, আইন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্য-প্রমাণ এবং অংশীদারত্বের বিদ্যমান ঘাটতি কমানো।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম। তিনি জানান, ঢাকা ডায়ালগ পাঁচটি পর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধ, তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর জন্য অভিন্ন ভাষা, মানদণ্ড ও স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরি; বিভিন্ন দেশে ঘটনার তথ্য তুলনাযোগ্য করতে সাধারণ সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাস প্রণয়ন; এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও বা অডিও শনাক্তকরণ ও উৎসের স্বচ্ছতাসহ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতার মানদণ্ড নির্ধারণ।

উদ্যোগটির আওতায় বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনায় সহায়তা, পুলিশ, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের ডিজিটাল প্রমাণ এবং এআই ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য হেল্পলাইন শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে ক্ষতিকর সিনথেটিক কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ঢাকা ডায়ালগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অনলাইনে নারীর দৈনন্দিন নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ডিজিটাল পরিসরে নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা ব্যবস্থার ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এআই-নির্ভর নির্যাতনের তদন্ত ও বিচারে বিদ্যমান আইনি ও সাক্ষ্য-প্রমাণসংক্রান্ত ঘাটতি তুলে ধরেন। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে ক্ষতি করা হলে তা প্রমাণের জটিলতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরু থেকেই তাদের পণ্য ও প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। সিনথেটিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাকে ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ডিজিটাল ও এআই-সহায়িত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের যেন সহায়তার জন্য এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে জন্য কার্যকর হেল্পলাইন ও সহজ রিপোর্টিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

পরে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আইনের ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা, কৃত্রিম বা সিনথেটিক কনটেন্ট মোকাবিলা এবং বিভিন্ন দেশে ভুক্তভোগীদের সহায়তার পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।

পরবর্তী ধাপে আগ্রহী কয়েকটি দেশকে ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ডের একটি প্রাথমিক রেফারেন্স ডকুমেন্ট তৈরির জন্য কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। পরে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নথিটি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন