রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কারাগারে চালু হচ্ছে ভিডিও কল, সপ্তাহে একবার ১০ মিনিট কথা বলবেন বন্দিরা

কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও এবার স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ পাবেন বন্দিরা। পাইলট প্রকল্পের আওতায় মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ইতোমধ্যে এ সুবিধা চালু হয়েছে। নির্দিষ্ট নিয়ম ও নিরাপত্তা বিধি মেনে সপ্তাহে একবার সর্বোচ্চ ১০ মিনিট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ পাবেন কারাবন্দিরা। পর্যায়ক্রমে এ সুবিধা দেশের সব কারাগারে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে কারা অধিদপ্তরের।

কারাগারে মাদক প্রবেশ ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বন্ধে নেওয়া হচ্ছে কঠোর পদক্ষেপ। কারা সদর দপ্তরে ড্রাগ পরীক্ষার মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা, খাবারের মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন, কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের কল্যাণে আজীবন রেশন দেওয়ার বিষয়টিও সরকার নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে।

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কারাগারকে শুধু বন্দি রাখার স্থান হিসেবে নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের উপযোগী একটি নিরাপদ ও মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।

কারা অধিদপ্তরের জেলার (লজিস্টিক অ্যান্ড মিডিয়া) মো. মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, “কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারাগার হবে নিরাপদ ও মানবিক। সারাদেশে শিগগিরই কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে।”

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল সরাসরি সাক্ষাৎ। নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে কারাগারে এসে টোকেন সংগ্রহ করে স্বজনদের বন্দির সঙ্গে দেখা করতে হতো। নতুন ভিডিও কল সুবিধা চালু হলে দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। তবে এ সুবিধা ব্যবহারে কারা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে।

দ্বিগুণের বেশি বন্দি

কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছেন। বিপরীতে কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি বর্তমানে কারাগারগুলোতে অবস্থান করছেন।

কারাগারে থাকা, খাবার ও চিকিৎসা বন্দিদের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া হয়। বন্দিদের ব্যবহারের জন্য থালা, বাটি ও কম্বল সরবরাহ করা হয়, যা মুক্তির সময় ফেরত দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের নির্ধারিত পোশাক পরতে হয়। তবে বিচারাধীন বা হাজতি বন্দিরা নিজেদের পোশাক ব্যবহারের সুযোগ পান।

কারাগারের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বন্দিদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হয়। নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।

খাবার ও চিকিৎসায় গুরুত্ব

কারাগারে সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী দিনে তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়। সকালের নাস্তায় সাধারণত গুড় ও রুটি এবং দুপুর ও রাতে ভাতের সঙ্গে মাছ বা মাংস, ডাল ও সবজি দেওয়া হয়। বিশেষ দিবসে বন্দিদের জন্য উন্নতমানের খাবারের বিশেষ বরাদ্দও রয়েছে।

বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন হলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কারা অধিদপ্তরের জেলার মো. মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, বন্দিদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি ল্যাব চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে। তাদের পদায়ন হলে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরও বাড়বে।

মাদক প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’

কারাগারে মাদক প্রবেশ ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে কারা সদর দপ্তরে ড্রাগ পরীক্ষার মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কারাগারে মাদক শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

একই সঙ্গে কারাগারকে স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব করতে সবুজায়ন কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

উৎপাদনমুখী কাজে বন্দিরা

বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল তৈরি, বেকারি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কাজে তাদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের মতো কার্যক্রমও চালু রয়েছে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সাবান উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। উৎপাদিত সাবান বন্দি ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বন্দিদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ঢাকা জেলে রুটি তৈরির কার্যক্রম আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে চীন থেকে আমদানি করা রুটি মেকার স্থাপন করা হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য কম সময়ে একই মানের রুটি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতাও কমেছে।

তিনি বলেন, বিশেষ দিবসে বন্দিদের খাবারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে। বিভিন্ন কারাগারে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ পানি ও প্রশিক্ষিত জনবল

কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্দি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর, ডেপুটি জেলার, জেলার ও জেল সুপারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কারা নিরাপত্তা রক্ষা, বন্দি পালানো প্রতিরোধ, অনিয়ম প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক সেবায় অসাধারণ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়ন এবং পদক, প্রশংসাপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবসরেও রেশন পাবেন কারারক্ষীরা

কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা ছিল অবসর-পরবর্তী কল্যাণ। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের আজীবন রেশন দেওয়ার বিষয়টি সরকার নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে কারা অধিদপ্তর।

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও একটি আধুনিক কারা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন ঘটবে। কারাগার হবে আরও নিরাপদ, মানবিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর। একই সঙ্গে বন্দিরা সংশোধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন