রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন অন্য কোনো বৈশ্বিক সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে না যায়, সে জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিষয়টি সর্বদা সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এ সংকট নিরসনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ (ইউএনএইচসিআরের হিসাবে ১২ লাখ) বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা এবং নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।’

প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা, জমি ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা দিয়ে আসছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া (ফেন্সিং) ও নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থা চালুসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশ সফলভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আবারও সফল প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও সক্রিয় রয়েছে।

বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ বা সর্বাত্মক সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকাল মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সতর্ক করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি এ ধরনের সহায়তা রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই জরুরি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত একটি ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’ বা রূপান্তরকালীন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।

অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন