শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের নতুন শক্তি: রপ্তানি ছাড়িয়ে প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে আধিপত্য

গত দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় কম খরচে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দেশটি এখন প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, কৌশলগত শিল্প এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, চীন এখনও বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর অন্যতম। ২০২৫ সালে দেশটির পণ্য রপ্তানির মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। বিপুল এই রপ্তানি দেশটির বৈশ্বিক বাণিজ্য সক্ষমতার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে চীনের শক্তিশালী অবস্থানেরও ইঙ্গিত দেয়।

তবে বর্তমান বিশ্বে চীনের বাণিজ্যিক ক্ষমতাকে শুধু রপ্তানির অঙ্ক দিয়ে মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। দেশটির অন্যতম বড় শক্তি হলো উৎপাদনের সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করা। কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংযোজন, লজিস্টিকস এবং শিল্পের বিভিন্ন মান নির্ধারণেও চীনের প্রভাব রয়েছে।

এর ফলে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিসহ বহু বৈশ্বিক শিল্প এখনও চীনের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।

অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শুল্ক আরোপ এবং বিভিন্ন দেশের ‘ডি-রিস্কিং’ বা চীননির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বেইজিংও রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহিরাগত ঝুঁকির বিরুদ্ধে আরও সহনশীল করার চেষ্টা করছে।

কৌশলগত প্রযুক্তিতে বাড়ছে চীনের অবস্থান

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উদীয়মান ও কৌশলগত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে দেশটির দ্রুত অগ্রগতি। তৈরি পোশাক কিংবা সাধারণ ভোগ্যপণ্যের উৎপাদক হিসেবে প্রচলিত পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি), সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম এবং শিল্পভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে দেশটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) বিভিন্ন বিশ্লেষণেও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান উঠে এসেছে। ফলে ব্যাটারি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি দেশটির অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য এই শিল্পগুলো নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ ও শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উপস্থিতিও বাড়ছে।

রপ্তানিকারক থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী

বিদেশে চীনা বিনিয়োগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শুধু নিজ দেশে পণ্য তৈরি করে বিদেশে বিক্রির পরিবর্তে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান এখন অন্য দেশে কারখানা স্থাপন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্প অংশীদারত্ব, সম্পদ অধিগ্রহণ এবং নিজস্ব বিপণন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরির দিকে এগোচ্ছে।

এই প্রবণতা চীনকে শুধু ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক উৎপাদক ও বিনিয়োগকারী শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছে।

তবে এই অগ্রযাত্রা বাধাহীন নয়। উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিভিন্ন দেশের বিধিনিষেধ, জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্য বাধা চীনা কোম্পানিগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু কত বেশি পণ্য রপ্তানি করছে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং উন্নত প্রযুক্তিতে সক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনের গুণগত মান এবং কৌশলগত শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখার সামর্থ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে চীন কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে দেশটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবেই থাকবে। সে ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব শুধু পণ্য রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্তি প্রয়োগের একটি নতুন কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করবে।

সূত্র ও বিশ্লেষণ: মাহদি জোলফাঘারি, পিএইচডি; সহযোগী অধ্যাপক, এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগ, আল্লামেহ তাবাতাবাই বিশ্ববিদ্যালয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন