রাশিদ খানের চিত্রকর্মে নদীর সৌন্দর্য, স্মৃতি ও দূষণের বেদনা; প্রদর্শনীর দ্বিতীয় সন্ধ্যায় বাঁশি, বাউল গান ও নদী নিয়ে কথোপকথন
রাজধানীর বনানীতে ঢাকা গ্যালারিতে চলছে বহুমুখী চিত্রশিল্পী রাশিদ খানের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নদীলিপি : রিভার স্ক্রিপ্ট’। শিল্প-লেখক জাভেদ জলিলের কিউরেটোরিয়াল আয়োজনে প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। নদীর সৌন্দর্য, স্মৃতি, জীবন ও দূষণের বেদনা নিয়ে সাজানো প্রায় ৬০টি চিত্রকর্ম দর্শকদের মুগ্ধ করে।
গত ৬ নভেম্বর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকা গ্যালারিতে চিত্রপ্রেমী ও শিল্পবোদ্ধাদের উপস্থিতি বাড়ে। ছাদ থেকে ঝুলানো তাম্রাভ জাল, ফিরোজা ও পলির উষ্ণ রঙের ক্যানভাস এবং সাদা-কালো আঁচড়ে ফুটে ওঠে নদীর বহুমাত্রিক রূপ।
প্রদর্শনীতে চিত্রা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, রূপসা, তিস্তা, ভৈরব, পায়রা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, যমুনা, কপোতাক্ষ, মধুমতি, ধরলা, বুড়িগঙ্গা, হালদা ও পানগুছি—১৬টি নদীর বিভিন্ন সময়ের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। অ্যাক্রিলিক, ওয়াটার, চারকোল, পেন্সিল ও মিক্সড মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি এসব চিত্রকর্মে নদীর নান্দনিকতা ও বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটেছে।
নদীর সৌন্দর্য থেকে দূষণের বেদনা
ক্যানভাসে পুরনো স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা ও বাউলদের ছবি দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নদীকেন্দ্রিক অতীতের স্মৃতিতে। পাশাপাশি উঠে এসেছে বুড়িগঙ্গার বর্তমান করুণ চিত্র। নদী দখল, দূষণ, কৃত্রিম বর্জ্য, দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত পানির বাস্তবতা শিল্পীর তুলিতে ফুটে উঠেছে।
‘Turmoil: The Present River’ এবং ‘পলিথিনে রুদ্ধশ্বাস’ শীর্ষক চিত্রকর্মে নদীর বিপর্যস্ত অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। নদীর এই পরিবর্তন দর্শনার্থী ও শিল্পবোদ্ধাদের গভীরভাবে আলোড়িত করে।
শিল্পী রাশিদ খানের ভাষায়, ‘আমাদের সবার ভেতরেই একটা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আমি আমার এই চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমাদের সবার ভেতরের সেই অভ্যন্তরীণ নদীকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, নদী কেবল দেখার বা আঁকার বিষয় নয়; সময়, মানুষ, ভূদৃশ্য ও জীবনের পরিবর্তনশীল গল্প দেখার একটি লেন্স।
নদী সুরে বাঁশি ও বাউল গান
প্রদর্শনীর দ্বিতীয় সন্ধ্যায় আয়োজিত বিশেষ পর্ব ‘নদী সুর’ দর্শকদের নিয়ে যায় এক শৈল্পিক আবহে। অনুষ্ঠানের শুরুতে বেনারস থেকে চিত্রশিল্পে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে আসা তরুণ শিল্পী তপু নদীকে কেন্দ্র করে তৈরি চারটি বাঁশির কম্পোজিশন পরিবেশন করেন। চিত্রশিল্প ও সংগীতের মেলবন্ধন নিয়ে তাঁর বক্তব্যও দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
এরপর মানিকগঞ্জের নদীপাড়ের মানুষ বাউল সাধক শাহজাহান মুন্সী নদীঘনিষ্ঠ জীবন ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে গান পরিবেশন করেন। নদীর সঙ্গে তাঁর জীবনের সম্পর্ক উঠে আসে বাউল গানে।
নদী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী কাকলী প্রধান। নদী দখল ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে ছবি তুলতে গিয়ে করপোরেট ও প্রভাবশালী মহলের বাধা এবং জীবনের ঝুঁকির মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা জানান তিনি। কিউরেটর জাভেদ জলিলের সঙ্গে কথোপকথনে নদী নিয়ে তাঁর বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রকল্প ও লঞ্চঘাটে আয়োজিত প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী ও সংগীতশিল্পী সুমনা হক, ব্যান্ড চিরকুটের ভোকালিস্ট সুমি, সংগীতশিল্পী আলিফ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা।
নদীর স্মৃতিতে শিল্পীর শৈশব
অনুষ্ঠানের শেষভাগে শিল্পী রাশিদ খানের বড় ভাই বিশিষ্ট স্থপতি জাহিদ আই খান ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় ছবি আঁকায় তিনি সিনিয়র গ্রুপে প্রথম হতেন, আর রাশিদ জুনিয়র গ্রুপে প্রথম হতেন।
পরবর্তীতে তিনি স্থাপত্যে চলে গেলেও রাশিদ শিল্পচর্চা ধরে রেখেছেন। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে নদী দেখার স্মৃতি আজ ভাইয়ের চিত্রকর্মে নতুনভাবে উপলব্ধি করছেন বলেও জানান তিনি।
প্রদর্শনীতে বিশেষ আর্ট-পাবলিকেশন
প্রদর্শনী উপলক্ষে উন্মোচন করা হয়েছে ‘নদীলিপি—দ্য রিভার স্ক্রিপ্টস হোয়ার দ্য রিভার স্পিকস’ শীর্ষক বিশেষ আর্ট-পাবলিকেশন। ৩০০ টাকা দর্শনী মূল্যের বইটিতে রাশিদ খানের চিত্রকর্ম, নিজস্ব গীতকবিতা এবং কিউরেটর জাভেদ জলিলের শিল্পবিশ্লেষণ ও কাব্যিক লেখা স্থান পেয়েছে।
জাভেদ জলিল কিউরেটোরিয়াল অনুসন্ধান, গ্রন্থনা ও লেখার মাধ্যমে চিত্রকর্মের সঙ্গে শব্দ ও সাহিত্যের সংযোগ তৈরি করেছেন। প্রদর্শনীতে শিল্পীকে ‘দ্য এনালগ ড্রিমার’ হিসেবে অভিহিত করে দৃশ্যশিল্প, টেক্সট ও সাউন্ডের সমন্বয়ে ভিন্নধর্মী শিল্প-অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকা গ্যালারিতে প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় নদীকে কেন্দ্র করে বিশেষ সাংস্কৃতিক আড্ডা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে।
আগামী ১০ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় জাভেদ জলিলের পরিচালনায় ‘Art in Everyday Life’ শীর্ষক আর্ট ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যায় থাকবে ‘নদী পাঠ’। এ ছাড়া ৭ নভেম্বর ‘নদী সাহিত্য’, ৮ নভেম্বর ‘নদী কথা’, ৯ নভেম্বর ‘নদী সুর’, ১১ নভেম্বর ‘নদী কথা’, ১২ নভেম্বর ‘নদী গল্প’, ১৩ নভেম্বর ‘নদী সুর’ এবং ১৪ নভেম্বর ‘নদী পাঠ’ আয়োজন করা হবে।
১৫ নভেম্বর সমাপনী সন্ধ্যায় ‘নদীলিপি’ শীর্ষক বিশেষ আড্ডার মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রদর্শনী।

