পার্থ বড়ুয়া, আহমেদ নেওয়াজ ও পিলু খানের প্রাণবন্ত আড্ডা-গানে মুখর ঢাকা গ্যালারি | নদী, চিত্রশিল্প ও জীবনবোধের আন্তঃসম্পর্কে মননশীল আলোচনা
রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ঢাকা গ্যালারিতে চলছে বহুমুখী চিত্রশিল্পী রাশিদ খানের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নদীলিপি : দ্য রিভার স্ক্রিপ্ট (River Script)’। শিল্প-লেখক জাভেদ জলিলের কিউরেটোরিয়াল আয়োজনে ১৫ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে নদী, স্মৃতি, জীবনবোধ ও পরিবেশের নানা দিক চিত্রকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীর প্রথম দিকে দর্শনার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও, গত ৬ নভেম্বর দ্বিতীয় দিনের ছুটির ভিড়ের ধারাবাহিকতায় শনিবার (৭ নভেম্বর) তৃতীয় দিনেও বিভিন্ন বয়স, পেশা ও শ্রেণির চিত্রপ্রেমীদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। গ্যালারিতে আগত দর্শনার্থীরা ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর্মগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নদী সুরক্ষার এই শৈল্পিক প্রয়াসের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
নদী সাহিত্য থেকে নদী সুরের আড্ডা
প্রদর্শনীর তৃতীয় সন্ধ্যায় নির্ধারিত সূচিতে ‘নদী সাহিত্য’ পর্বে বিশিষ্ট লেখক ও চলচ্চিত্রকার নূরুল আলম আতিকের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর উপস্থিতি সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে পর্বটি নতুনভাবে সাজিয়ে ‘নদী সুর’-এর বিশেষ আড্ডা ও গানে রূপ দেওয়া হয়। চিত্রশিল্পী রাশিদ খান এবং কিউরেটর জাভেদ জলিলের সাবলীল সঞ্চালনায় আয়োজিত এই বিশেষ পর্বে অংশ নেন দেশের খ্যাতিমান তিন সংগীত ব্যক্তিত্ব—সংগীতশিল্পী ও সুরকার পার্থ বড়ুয়া, সোলস ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বরেণ্য শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ এবং রেনেসাঁ ব্যান্ডের পিলু খান।
শিল্প, সংগীত ও নদীকে কেন্দ্র করে তাঁদের প্রাণবন্ত কথোপকথনে গ্যালারির পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও প্রাণময়।
মাইকেলেঞ্জেলোর শিল্পকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা
আড্ডার একপর্যায়ে শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ কিউরেটর জাভেদ জলিলের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ শিল্পবোধ ও ছবি আঁকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চমৎকার আলোচনায় অংশ নেন।
এ সময় তিনি সাম্প্রতিক ভ্যাটিকান সিটি ভ্রমণ এবং সেখানে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর মাস্টারপিসগুলো স্বচক্ষে দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা উপস্থিত দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
একই সঙ্গে পার্থ বড়ুয়া ও জাভেদ জলিলের মধ্যে গান, নদী, চিত্রশিল্প এবং শিল্পের গভীর আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে মননশীল কথোপকথন হয়। উপস্থিত দর্শকেরা তা অত্যন্ত উপভোগ করেন।
আড্ডার শেষাংশে পিলু খান নদী ও জীবনবোধের গান পরিবেশন করে পুরো গ্যালারি প্রাঙ্গণে সুরের এক মোহনীয় আবহ সৃষ্টি করেন। ক্যানভাসের দৃশ্যশিল্পের সঙ্গে গুণী শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা ও গান রাত ৯টা পর্যন্ত গড়ায়।
১৬ নদীর রূপ ও আলোকছায়া ক্যানভাসে
প্রদর্শনীতে প্রায় ৬০টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি প্রধান নদীর বিভিন্ন সময়ের রূপ ও আলোকছায়া ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
চিত্রা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, রূপসা, তিস্তা, ভৈরব, পায়রা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, যমুনা, কপোতাক্ষ, মধুমতি, ধরলা, বুড়িগঙ্গা, হালদা ও পানগুছি নদীর নানা দৃশ্য চিত্রকর্মে তুলে ধরেছেন শিল্পী।
শিল্পকর্মগুলোতে অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাস, অয়েল ক্যানভাস, ওয়াটার অন পেপার ও চারকোলসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে।
পুরনো স্টিমার, লঞ্চ ও বাউলদের চিত্রের পাশাপাশি ক্যানভাসে আলাদাভাবে উঠে এসেছে বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর বর্তমান করুণ চিত্র। দখল, দূষণ ও বর্জ্যের কারণে হারিয়ে যাওয়া প্রাণচাঞ্চল্যের বিপরীতে নদীর রুদ্ধশ্বাস অবস্থাকে শিল্পীর ‘Turmoil: The Present River’ বা ‘পলিথিনে রুদ্ধশ্বাস’ চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
এসব চিত্রকর্ম দর্শনার্থীদের মধ্যে নদী নিয়ে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করছে।
নদী মানুষের জীবনবোধ ও স্মৃতির লেন্স
শিল্পী রাশিদ খানের কথায়, “আমাদের সবার ভেতরেই একটা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আমি আমার এই চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমাদের সবার ভেতরের সেই অভ্যন্তরীণ নদীকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।”
ক্যানভাসে নদীকে কেবল একটি ল্যান্ডস্কেপ হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনবোধ ও স্মৃতির ‘লেন্স’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
নদীর পরিবর্তিত রূপ, পরিবেশগত সংকট এবং মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্ককে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীটি দর্শকদের ভাবনার নতুন পরিসর তৈরি করছে।
১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী
আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় নদীকে কেন্দ্র করে বিশেষ সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক আড্ডা ও অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে আজ ৮ নভেম্বর ‘নদী কথা’ এবং আগামী ১০ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় জাভেদ জলিলের পরিচালনায় বিশেষ আর্ট ওয়ার্কশপ ‘Art in Everyday Life’ অনুষ্ঠিত হবে।

