হোটেল-মোটেলের ৭০–৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং; পর্যটক বরণে প্রস্তুত চার শতাধিক জিপ, নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ
শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত পার্বত্য জেলা বান্দরবান। ছুটিতে ভ্রমণপ্রিয় মানুষের আগমন বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় জেলার হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকের বাড়তি চাপ সামাল দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে চার শতাধিক জিপ গাড়িও।
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের লুকোচুরি, ঝরনার কলতান আর সবুজ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য বান্দরবানকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। প্রতিবছরই প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে এখানে ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। এবার শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রবারণা উৎসবের টানা ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
আগাম বুকিংয়ে ব্যস্ত হোটেল-রিসোর্ট
বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছুটির আমেজ ঘিরে আবাসন খাতে বাড়তি ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে আগাম বুকিং হয়েছে। ছুটি যত ঘনিয়ে আসবে, বুকিংয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, পর্যটকদের বরণ করতে তাঁরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় জেলায় কক্ষসংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
হোটেল গ্র্যান্ড ভ্যালির ব্যবস্থাপক সুমন বলেন, পূজা ও প্রবারণা উৎসবের টানা ছুটিতে পর্যটকদের বরণ করতে তাঁদের হোটেলের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে হোটেলটির প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। টানা ছুটি থাকায় এবার পর্যটকদের ভালো সমাগম হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
প্রকৃতির টানে পর্যটকদের আকর্ষণীয় গন্তব্য বান্দরবান
বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ নীলাচলের পাহাড়চূড়া, মেঘলা পর্যটনকেন্দ্র ও শৈলপ্রপাতের ঝরনাধারা। পাশাপাশি দেবতাখুম, নাফাখুম ও আমিয়াখুমের মতো প্রাকৃতিক গন্তব্যও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
পাহাড়, ঝরনা, নদী ও মেঘের মিতালিতে ঘেরা এসব স্থানে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান ভ্রমণপ্রেমীরা। ছুটির সময়ে এসব পর্যটনকেন্দ্রে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে আবহাওয়া, যাতায়াতের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশসংক্রান্ত নিয়মকানুন সম্পর্কে আগেই খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটক পরিবহনে প্রস্তুত চার শতাধিক জিপ
বান্দরবানের পাহাড়ি পথে পর্যটকদের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে চার শতাধিক জিপ, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে পরিচিত। পর্যটকের চাপ বাড়লেও যেন পরিবহনসেবায় বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য চালকেরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বান্দরবান জিপ ও মাইক্রোবাস মালিক সমিতির লাইনম্যান কামাল বলেন, পর্যটকদের সেবা দিতে চালকদের নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাঁদের যাতায়াতের জন্য চার শতাধিক জিপ গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ছুটিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে পর্যটকদের সমাগম ঘটবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে পরিবহন খাতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত চালক ও শ্রমিকদের আয় বাড়বে এবং আগের ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
পর্যটকের আগমন বাড়লে আবাসন ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পর্যটননির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মব্যস্ততাও বাড়বে। ফলে দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসনসংকট এবং শেষ মুহূর্তে কক্ষ না পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ কারণে ভ্রমণে আসার আগে হোটেল বা রিসোর্টের কক্ষ বুকিং নিশ্চিত করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগাম বুকিং ছাড়া এলে পছন্দের আবাসন পেতে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন পর্যটকেরা।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ প্রস্তুতি
ছুটিতে পর্যটকদের আগমন নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার।
তিনি বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে তাঁদের ভ্রমণ যাতে নির্বিঘ্ন হয়, সে জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রবারণা উৎসবের টানা ছুটিকে ঘিরে বান্দরবানের পর্যটন খাতে বাড়তি আশার সঞ্চার হয়েছে। আবাসন ও পরিবহনসেবার প্রস্তুতি, আগাম বুকিংয়ের সাড়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পর্যটকদের বরণ করতে অপেক্ষায় রয়েছে পাহাড়ি এই জেলা।

