সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

পাইকারিতে কমেছে সয়াবিন-পাম তেলের দাম, খুচরা বাজারে সুফল নেই

সপ্তাহে লিটারপ্রতি সয়াবিনে ৩.১৩ ও পাম তেলে ২.৪১ টাকা কমেছে, তদারকির ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ ভোক্তাদের

চট্টগ্রামের চাকতাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত এক সপ্তাহে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কমলেও খুচরা বাজারে এর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। পাইকারি পর্যায়ে দাম কমার পরও খুচরা দোকানে আগের দামেই খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি বোতলজাত তেলও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। পাইকারি ও খুচরা দামের এই ব্যবধানের জন্য বাজার তদারকির ঘাটতিকে দায়ী করছেন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।

১১ অক্টোবর চাকতাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৭৭ টাকা ৩৩ পয়সা এবং পাম তেল ১৫৬ টাকা ৭৫ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে, খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ২১০ টাকা এবং পাম তেল বিক্রি হয়েছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকার মধ্যে।

ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা ১৩ পয়সা এবং পাম তেলের দাম ২ টাকা ৪১ পয়সা কমেছে। তবে পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা পর্যায়ে তার প্রতিফলন না থাকায় সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয় কমছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় স্বস্তি পাইকারিতে

ভোজ্যতেলের পাইকারি ব্যবসায়ী কামরুল হুদা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট কমে যাওয়া এবং সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের বুকিং রেট গত মাসে টনপ্রতি ১ হাজার ২২৩ ডলার থেকে কমে ১ হাজার ২০০ ডলারে নেমেছে।

চাকতাই-খাতুনগঞ্জ পাইকারি ও সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, খাতুনগঞ্জে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ পণ্যই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে।

খুচরা বাজারে কমেনি দাম, বেশি রাখার অভিযোগ

চট্টগ্রামের কাজির দেউড়ি, বহদ্দারহাট, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও চকবাজারের খুচরা দোকানগুলোতে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত তেলও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জরিপ অনুযায়ী, ১০৪ টাকা নির্ধারিত মূল্যের ৫০০ মিলিলিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছিল ১০৫ টাকায়। অন্যদিকে, ২০৪ টাকা নির্ধারিত মূল্যের এক লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছিল ২১০ টাকায়।

পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের এই ব্যবধান নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, পাইকারিতে দাম কমলেও খুচরা পর্যায়ে তা কার্যকর না হওয়ায় বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

আমদানিনির্ভর ভোজ্যতেলের বাজার

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বাকি চাহিদার বড় অংশ আসে চালের তুষ ও সরিষার তেলসহ দেশীয় উৎস থেকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২২ লাখ ২৩ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে প্রায় ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৮৯৬ টন পাম তেল এবং ১৫ হাজার ৬১ টন সয়াবিন তেল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরও চালান আসছে। পাশাপাশি মিলমালিক ও আমদানিকারকদের কাছে আগের অর্থবছরের মজুতও রয়েছে।

রমজানের আগে সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। রমজানের আগে আরও চালান আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।

চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খোলার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে—এমন অসাধু কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

বাজার তদারকি জোরদারের দাবি

ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভোজ্যতেলের উচ্চমূল্য পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ঘাটফরহাদবেগ এলাকার ভোক্তা ইকবাল চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, আয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বাড়তে থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, রমজানের আগে ব্যবসায়ীদের একাংশ দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। এ আশঙ্কা মোকাবিলায় বাজার নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্লাহ বলেন, নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

পাইকারি বাজারে দাম কমার সুফল খুচরা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কার্যকর তদারকি, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন