ছাগল-ভেড়ার ভাইরাসজনিত রোগ পিপিআর (PPR) এবং গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত রোগ এফএমডি (FMD) নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি। তিনি বলেছেন, সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণীরোগের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উন্নয়ন সহযোগী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে টেকসই অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা ও শক্তিশালী সহযোগিতা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ইতালির রোমে এফএও আয়োজিত ‘FAO Global Conference for Actions on One Health in Agrifood Systems’-এর সাইড ইভেন্টে ‘ওয়ান হেলথ এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণীরোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের মাধ্যমে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পিপিআর ও এফএমডি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এসব রোগের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় আরও জোরালো টিকাদান কার্যক্রম ও সক্রিয় নজরদারির সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাগল-ভেড়ার ভাইরাসজনিত রোগ পিপিআর থেকে রোগমুক্ত মর্যাদা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি জানান, ডব্লিউওএএইচ-এর বৈশ্বিক কৌশল এবং ২০২৪-২০২৮ মেয়াদের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশে দেশব্যাপী ছাগল ও ভেড়ার পিপিআর টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নজরদারি কার্যক্রমে কোনো প্রাদুর্ভাব শনাক্ত না হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ডব্লিউওএএইচ-এর কাছে পিপিআর নির্মূল কর্মসূচির ডসিয়ার জমা দিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রগ্রেসিভ কন্ট্রোল পাথওয়ে অনুসরণ করে ২০২৫-২০২৮ মেয়াদের জন্য এফএমডি নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক এফএমডি টিকাদান কার্যক্রমের ছয়টি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে এবং সপ্তম ধাপ চলমান রয়েছে।
নিরাপদ ও টেকসই মাংস রপ্তানির ভিত্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি এফএমডিমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এফএও-এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ এফএমডির জন্য একটি ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন এবং প্রাণীরোগের প্রাদুর্ভাব তদন্ত ও প্রতিক্রিয়া বিষয়ে একটি ফিল্ড ম্যানুয়াল প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জাতীয় এফএমডি নিয়ন্ত্রণ কৌশল ২০২৫-২০২৮ এবং পিপিআর নির্মূলের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৮ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে।
আলোচনায় এফএমডির এসএটি-১ (SAT1) সেরোটাইপের বিশ্বব্যাপী বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো এই সেরোটাইপ শনাক্ত হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত পারাপার, প্রাণিসম্পদের চলাচল, প্রাণিসম্পদ-সম্পর্কিত উপকরণ আমদানি এবং ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রাণীর বর্ধিত চলাচলের মাধ্যমে এর প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি জোরদার, টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্যানেল আলোচনায় তানজানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুইগুলু লামেক নচেম্বা, চাঁদের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদেরাহিম আওয়াত আবেইথ, ক্যামেরুনের প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও প্রাণী শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী তাইগা, নাইজেরিয়ার প্রাণিসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ইদি মুখতার মাইহা, মঙ্গোলিয়ার খাদ্য, কৃষি ও হালকা শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্টেট সেক্রেটারি জামবালসেরেন তুমুর-উয়া, আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের ড. ওয়ার্কনেহ গেবেয়েহু এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মার্টিন সেলমায়ারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় ওয়ান হেলথ পদ্ধতির আওতায় সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণীরোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের মাধ্যমে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

