২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ • চার দিনের ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি • বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক • রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক শান্তি গুরুত্ব পাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রান্তকাল
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবারই প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তিনি।
ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতির পর প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির বরাতে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস এ তথ্য জানিয়েছে।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটরশোভাযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীকে হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিউইয়র্ক সফরকালে সেখানেই তাঁর অবস্থান করার কথা রয়েছে।
প্রবাসীদের স্বাগত
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নিউইয়র্কে বিএনপির নেতা-কর্মী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বিমানবন্দরের আশপাশ ও হোটেলের পথে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসেও এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। সফরজুড়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; তবে জাতিসংঘের কার্যক্রম অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাঁর জন্য ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছে, ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়ন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হবে।
এবারের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা এবারের অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর: এরদোয়ানসহ একাধিক নেতার সঙ্গে বৈঠক
মঙ্গলবার সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের স্বাগত প্রাতরাশে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
এদিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ার ফিলস-আইমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক এবং মেটার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোয়েল কাপলানের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনায় প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমানের অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর: রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যু সামনে
বুধবার আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা।
এরপর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি সেখানে তুলে ধরার কথা রয়েছে।
একই দিনে ‘Climate Action and the Just Transition’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কর্মসূচি রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর: ব্যস্ততম দিন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণের দিন প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু বন্ধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন তিনি।
ভাষণ শেষে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
২৫ সেপ্টেম্বর: নজর অর্থনৈতিক কূটনীতিতে
সফরের শেষ দিনে নিউইয়র্কে জেপিমরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ এই সফরের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি অংশ।
এদিন কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জাইদ আল হুসেইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের কর্মসূচিও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে
২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন।
জাতিসংঘের নথির তথ্য উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে, তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথমবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন ১৯৯৩ সালে এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি অধিবেশন ও বিশেষ আয়োজনে বক্তব্য দেন।
তারেক রহমানের জন্য এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সফর ও ভাষণ। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন—যা এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতিতে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

