বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

ইরাক ছাড়ছে আমেরিকা, সেপ্টেম্বরেই শেষ হচ্ছে দুই দশকের সামরিক উপস্থিতি

ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবশিষ্ট সদস্যদের প্রত্যাহার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ইরাকে থাকা সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শুরু হওয়া দুই দশকেরও বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি ফালেহ আল-জাইদি সম্প্রতি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠকে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করার বিষয়ে বাগদাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরাকি সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমাকে চূড়ান্ত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ধাপে ধাপে কমেছে মার্কিন সেনা

ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছিল ২০০৭ সালের দিকে। সে সময় দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সেনা কমানো হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে থাকা মার্কিন সেনাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও ইসলামিক স্টেট বা আইএসবিরোধী অভিযানে সহায়তা করা।

মার্কিন ও ইরাকি সরকারের মধ্যে ২০২৪ সালে করা সমঝোতার ভিত্তিতেই বর্তমান প্রত্যাহার পরিকল্পনা তৈরি হয়। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সরাসরি সামরিক অভিযান শেষ করার কথা ছিল। দ্বিতীয় ধাপে ইরাক থেকে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় আইএসবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তা চালানোর ব্যবস্থা রাখা হয়, যার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

আল-আসাদ ঘাঁটিও ইরাকের নিয়ন্ত্রণে

প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনী এরই মধ্যে ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সামরিক অবস্থান থেকে সরে গেছে। আনবার প্রদেশের আল-আসাদ বিমানঘাঁটি থেকে সর্বশেষ মার্কিন সেনারা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চলে যায় এবং ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ ইরাকি বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মার্কিন বাহিনীর অবশিষ্ট উপস্থিতি মূলত ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল এবং বাগদাদের কূটনৈতিক এলাকায় সীমিত ছিল। এরবিল এয়ার বেস ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ছিল অবশিষ্ট মার্কিন উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এরবিল থেকেও মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই প্রত্যাহারের বড় একটি অংশ সম্পন্ন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন ইরাক ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র?

মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকে শুধু সামরিক পরাজয় বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যে কয়েক বছর ধরে চলা একটি পরিকল্পিত সামরিক রূপান্তরের অংশ।

ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অনেকটাই অর্জন করেছে। ফলে ইরাকি সরকারের দৃষ্টিতে বিদেশি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় কমেছে।

অন্যদিকে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব

মার্কিন প্রত্যাহারের সময়টি মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকিতে ছিল। এসব হামলার কারণে মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হয়েছে।

ফলে প্রত্যাহার একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ, অন্যদিকে বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এর গতি ও সামরিক অবস্থান পুনর্বিন্যাসে প্রভাব ফেলছে।

আইএস কি আবার শক্তিশালী হতে পারে?

মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ইরাকে আইএস বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী আবার শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে কি না।

বর্তমানে আইএস আগের মতো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে সংগঠনটির সদস্য ও সমর্থকদের বিচ্ছিন্ন হামলা চালানোর সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। এ কারণে মার্কিন প্রত্যাহারের পর ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মানেই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং সরাসরি সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখার কাঠামো তৈরি হচ্ছে। ২০২৪ সালের রূপান্তর পরিকল্পনাতেও সামরিক মিশন থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অংশীদারত্বে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।

ইরাকের জন্য নতুন বাস্তবতা

মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর ইরাককে একই সঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি করে ইরাকি বাহিনীর ওপর পড়বে। দ্বিতীয়ত, কুর্দিস্তান অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামলাতে হবে। তৃতীয়ত, ইরানের প্রভাব এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

এদিকে ইরাক সরকার আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার কথা বলে আসছে। ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে বাগদাদের জন্য নিজের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে আরও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

২৩ বছর পর নতুন অধ্যায়

২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অধ্যায়ের সূচনা। পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহ দমন, ইরাকি বাহিনী পুনর্গঠন এবং ২০১৪ সালের পর আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে মার্কিন সেনারা দেশটিতে অবস্থান করে।

এখন সেই দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির শেষ অধ্যায় চলছে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হলে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকেরও বেশি সময়ের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। তবে এর অর্থ দুই দেশের সম্পর্কের অবসান নয়; বরং সামরিক ঘাঁটি ও সেনা উপস্থিতির পরিবর্তে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামোই হতে পারে ওয়াশিংটন-বাগদাদ সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়।

সূত্র: Associated Press, Al Jazeera, U.S. Lead Inspector General reports ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন