বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

ছাত্ররাজনীতি-শিক্ষকতা পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে মির্জা ফখরুল

এসএম দেলোয়ার হোসেন

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যার রাজনৈতিক পথচলার শুরু, সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনে যোগ হয়েছে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর তার প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম এসেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে প্রবেশ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। ফলে পারিবারিকভাবেই রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়।

ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। শিক্ষাজীবনেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তার অংশগ্রহণ ছিল।

তবে শিক্ষাজীবন শেষ করেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। কয়েক বছর সরকারি চাকরি করার পর ১৯৮৬ সালে পদত্যাগ করে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে জাতীয় রাজনীতিতে

সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার পর স্থানীয় পর্যায় থেকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন তার রাজনৈতিক জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন তিনি। কৃষি এবং পরবর্তী সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

দলীয় রাজনীতিতেও একই সময়ে তার অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ পথ

২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর প্রায় এক দশক বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘ সময়ের সরকারবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলীয় কর্মসূচি পরিচালনা এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়

ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিব—মির্জা ফখরুলের জীবনে দায়িত্বের পরিধি ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়েছে।

এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যুক্ত হতে পারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তার নাম চূড়ান্ত হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। আর যদি তিনি নির্বাচিত হন, তাহলে দীর্ঘদিনের মহাসচিব পদ থেকে তার বিদায় বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোয়ও নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিসভাতেও সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।

ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন