বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

গণভবন থেকে আত্মগোপন, এরপর সীমান্ত পেরিয়ে শিলং: নানকের মুখে দেশ ছাড়ার গল্প

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে থাকার একপর্যায়ে তার জামাইয়ের নির্দেশনায় তিনি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পার হন। ১৬ আগস্ট শিলংয়ে পৌঁছানোর পর মালদাহ হয়ে পরদিন কলকাতায় যান তিনি।

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের আত্মগোপন, দেশত্যাগ, শেখ হাসিনার অবস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা মামলা নিয়ে কথা বলেন নানক।

৫ আগস্টের আগে ও পরের পরিস্থিতি বর্ণনা করে নানক বলেন, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি গণভবনে ছিলেন। পরদিন শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তিনি গণভবন থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

নিজের দেশত্যাগের বর্ণনা দিতে গিয়ে নানক বলেন, ‘আমি আসলে প্রায় একেবারে পড়েই গিয়েছিলাম আমার শোয়ার জায়গায়। যখন আমার চৈতন্য উদয় হয়, তখন এক ক্লোজ রিলেশন এয়ারফোর্স, ও আমাকে ফোন করল। বলল যে, স্যার অমুকে ফোন করছে। তখন একটু বোধদয় হয়ে আমি ধরলাম। তো বলল যে, চিন্তা করবেন না, উনি বর্ডার ক্রস করেছেন সেফলি।’

এরপর একের পর এক আশ্রয়স্থল পরিবর্তন এবং ব্যবহৃত ফোন ফেলে দেওয়ার কথা জানান তিনি। নানক বলেন, ‘এরপরে একটি পর্যায়ে বুঝতে পারলাম যে, আমাকে এখন ধরার জন্য তারা মরিয়া হয়ে যাবে। ডিসাইড করে ফেললাম—আই হ্যাভ টু লিভ দ্য কান্ট্রি।’

তিনি বলেন, ‘আমার জামাই ডাক্তার, ফোন করল যে-বাবা আপনি বেরিয়ে যান। আমি যেভাবে যেভাবে বলব সেভাবে বেরিয়ে যাবেন এবং সে-ই গাইডটা করেছে মূলত। সে গাইডটা করে নিয়ে এসেছে, বের করে এনেছে।’

নানক জানান, ১৬ আগস্ট তিনি শিলংয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে মালদাহে যান। সেখানে তার মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরদিন তিনি কলকাতায় যান।

‘গত দু’বছরে কোনো রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি’

দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকায় স্বজন ও দেশের কথা মনে পড়ে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী—আমরা কর্মী পাগল মানুষ তো। কখনো কখনো আমার বুকটা ফেটে যায়।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি একেবারে পাকিস্তানি পাঞ্জাবী বাহিনীর বিরুদ্ধে ফ্রন্ট ফাইট করেছি। একটা আদর্শিক যুদ্ধ করেছি। সংগ্রাম করেছি। লড়াই করেছি।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনার কথা উল্লেখ করে নানক বলেন, ‘তখন তো প্রশ্ন জাগেই, আমি বেঁচে ছিলাম কেন? বেঁচে আছি কেন বা এই ঘটনা দেখার আগে কেন মৃত্যু হলো না!’

তিনি বলেন, ‘গত দু’বছরে কোনো রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। ভোরবেলা যে আজান দেয়, সেই ফজরের নামাজ পড়ার পরে একটু টায়ার্ড হয়ে শরীর যখন ছেড়ে দেয় তখন ঘুমাতে যাই।’

‘৫ আগস্ট ৩০ মিনিট দেরি করলে শেখ হাসিনাকে হত্যা করা হতো’

নেতাকর্মীদের বিপর্যয়ের মধ্যে রেখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে নানক বলেন, ‘৫ আগস্ট যদি ৩০ মিনিট দেরি করতেন, তাহলে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ওইদিন গণভবনে থাকা তার ছোট বোন শেখ রেহনাকে নির্মমভাবেই শুধু হত্যা করত না, নৃশংস নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করত।’

তার দাবি, ‘আজকে বেঁচে আছেন বলেই আজ সারা বিশ্ব বিবেক, ১৮ কোটি মানুষের বিবেক মিলে কিন্তু বলছে যে, শেখ হাসিনা ছাড়া এই দেশ পরিচালনা মতো যোগ্য নেতৃত্ব আর দ্বিতীয় কেউ নেই।’

ভারতের ওপর আস্থার কথা নানকের

ভারত সরকার তাকে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বা অবস্থানের নিশ্চয়তা দিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, ‘আমরা তো বিশ্বাস করি—যেকোনো চাপ বাংলাদেশের কচুপাতার পানির মতো যারা টলটলায়মান, সেই সরকারের কতখানি চাপ দেয়ার ক্ষমতা আছে? এবং সে চাপ যতই যাই হোক না কেন—এটা সামাল দেয়ার ক্ষমতা ভারত সরকারের আছে।’

শেখ হাসিনা ভারতে কেন গেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, ‘তারা ভারতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার কারণে, এসএসএফ-এর অফিসার ও বিমান বাহিনীর অফিসার সবাই মিলেই তো তারা দিল্লিতে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছেন।’

ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ভারতে নেওয়ার কার্যক্রমের নেতৃত্ব কে দিয়েছিল—এমন প্রশ্নে নানক বলেন, ‘আমি এটা এখন বলতে পারছি না।’

শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো আছেন উনি।’

ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নানক বলেন, ‘যে নিরাপত্তা উনাকে দেওয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকলই দেওয়া হচ্ছে।’

‘আমরা গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েছিলাম’

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণ জানতে চাইলে নানক বলেন, ‘আমরা একটা গভীর ষড়যন্ত্রের, ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।’

শেখ হাসিনা সরকার পতনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘উনি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই কিন্তু ৬ মাস আগে থেকে বলা শুরু করেছেন যে, আমাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নানক বলেন, ‘ড. ইউনূস আমার বিরুদ্ধে সরকার পতনের জন্য ষড়যন্ত্র করছে।’

‘চোখের ইশারা দিলে পাঁচ থেকে ১০ লাখ লোক জমায়েত করতে পারতাম’

আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা সম্পর্কে নানক বলেন, ‘উনি যদি আমাদেরকে শুধু চোখের ইশারা দিতেন—তাহলে ঢাকা শহরে আমরা পাঁচ থেকে ১০ লক্ষ লোকের জমায়েত করে ফেলতে পারতাম।’

তিনি দাবি করেন, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি ছিল এবং সেখান থেকেও বড়সংখ্যক নেতাকর্মী ঢাকায় আসতে পারতেন।

তবে এমন পরিস্থিতিতে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারত বলে স্বীকার করেন নানক। তিনি বলেন, ‘অনেক অনেক হয়ে যেত। আমরাও কি ছেড়ে দিতাম? নো।’

তার ভাষায়, ‘উনি রক্তপাত চাননি।’

‘আওয়ামী লীগের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব না’

দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানক বলেন, ‘দিস ইজ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব না। সম্ভব হয় নাই।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটা একশ পারসেন্ট, ফেয়ার অ্যান্ড ফ্রি ইলেকশন দিক—যদি আমরা টু থার্ড মেজরিটি না পাই…..প্রমাণ হোক জাতিসংঘ বাহিনী আসুক। এসে নির্বাচন করুক। যদি আওয়ামী লীগ টু থার্ড মেজরিটি না পায়—তাহলে আমরা নাকে খত দিয়ে সবাই একসঙ্গে রাজনীতি ছেড়ে দেব।’

কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস নেই: নানক

কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস রয়েছে—এমন খবরকে ‘মুখরোচক’ বলে মন্তব্য করেন নানক।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন খবর বের হয়। এগুলা মুখরোচক।’

তার দাবি, ‘অফিস বলতে কোনো জিনিসের অস্তিত্ব নাই এখানে।’

তবে কোথাও বসার সুযোগ পেলে নেতাকর্মীরা সেখানে যেতে পারেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মোহাম্মদপুরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি

কলকাতায় যাওয়ার পর থেকেই নিজের নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানান নানক।

তিনি বলেন, ‘আমি কলকাতায় যে আসলাম—সেদিন থেকেই আমি আমার এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। তাদের সুখে-দুঃখে কষ্ট-ক্লেশের আমি ভাগীদার হওয়ার চেষ্টা করি।’

গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের খোঁজ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

হত্যা মামলায় ‘আইনগতভাবে লড়ছেন’

জুলাই আন্দোলনে মোহাম্মদপুরে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে নিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে নানক বলেন, ‘আমি কৌশলগতভাবে লড়ছি, লড়াই করছি আইনগতভাবে।’

৯ জন হত্যার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উদর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপড়ানোর চেষ্টা।’

তার দাবি, মামলার নথিতে বিভিন্ন জায়গায় ‘তার নির্দেশে’ কথাটি থাকলেও তাকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন—এমন কোনো সাক্ষ্য নেই।

নানক বলেন, ‘আমি কি ওখানে অস্ত্র নিয়ে গুলি করতে গিয়েছি? এরকম কোনো প্রমাণ আছে? দেখাতে পারবে? বলুক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইন ও আদালত, বিচারালয় যদি আইনের গতিতে চলে আমি আপনাকে বলতে পারি—যত হত্যা মামলা দিয়েছে ইনক্লুডিং আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইসিটি আদালত থেকে শুরু করে। কোনো মামলা টিকবে না। কোনো মামলার অস্তিত্ব থাকবে না।’

‘শেখ হাসিনার আগে আমরা দেশে পৌঁছাবো’

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি ফিরবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, ‘অবশ্যই আমি, আমরা তো ওনার আগে যাব, পৌঁছবো। পৌঁছাবোই।’

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার তাকে দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, ‘বেঁচে থাকলে দেখা যাবে। আমি যাতে মৃত্যুবরণ না করি, দোয়া করবেন।’


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন