অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬

এক বছরে সারের আমদানি ১৪% বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে ৪৯%, গ্যাস সংকটে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা এবং দেশে গ্যাসের ঘাটতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত, তবু উচ্চমূল্যের কারণে সরকারের ব্যয় প্রায় অর্ধেক বেড়ে গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৪৫ লাখ ৭২ হাজার টন ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার আমদানি করা হয়েছে। এসব সারের কাস্টমস মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা

অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৪০ লাখ ১২ হাজার টন সার আমদানি করা হয়েছিল, যার জন্য ব্যয় হয়েছিল ২৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৪ শতাংশ এবং ব্যয় প্রায় ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোন সারের কত আমদানি

বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশ থেকে—

  • ইউরিয়া: ৯ লাখ ১২ হাজার টন (ব্যয় ৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা)
  • ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি): ৮ লাখ ৭৯ হাজার টন (ব্যয় ৬ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা)
  • মিউরেট অব পটাশ (এমওপি): ১০ লাখ ৬০ হাজার টন (ব্যয় ৪ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা)
  • ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি): ১৭ লাখ ২১ হাজার টন (ব্যয় ১৭ হাজার ৫২২ কোটি টাকা)

বাংলাদেশে এসব সারের প্রধান সরবরাহকারী দেশের মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার উল্লেখযোগ্য।

উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাধা গ্যাস সংকট

কৃষি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলো প্রায় ১১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করেছে। এছাড়া কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনকে (বিসিআইসি) প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহ করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাফকোর উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে নতুন সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সার শিল্পে চাপ আরও বেড়েছে।

আমদানি কমাতে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ

বিসিআইসির কর্মকর্তাদের মতে, সার আমদানির ব্যয় কমাতে হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য সার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি কমবে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও হ্রাস পাবে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই নৌপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর।

এই পরিস্থিতিতে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চীন, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে সরবরাহ ঝুঁকি কমানো যায়।

চাহিদা অনুযায়ী আমদানি অব্যাহত

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের চাহিদা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সার আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে বিসিআইসি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সারের আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল করা, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এতে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকারের আমদানি ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন