অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬

বন্ধুর বদলে এআই! ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কেন ভরসা বাড়ছে চ্যাটবটের ওপর?

সম্পর্ক, কর্মজীবন ও মানসিক দ্বিধায় ChatGPT-সহ এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে; তবে সতর্ক করছেন মনোবিজ্ঞানীরা

“চাকরি ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?”, “কাউকে কষ্ট না দিয়ে কীভাবে কথাটা বলব?”, কিংবা “আমি কি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি?”—এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন আর শুধু বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা মনোবিদের দ্বারস্থ হচ্ছেন না অনেকেই। বরং ক্রমেই বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর চ্যাটবট, যেমন ChatGPTGemini-এর ব্যবহার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত উত্তর, সহজলভ্যতা এবং বিচারহীন কথোপকথনের অভিজ্ঞতা মানুষকে ব্যক্তিগত বিষয়েও এআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে উৎসাহিত করছে। ফলে এআই ধীরে ধীরে শুধু তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যম নয়, বরং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে।

কেন মানুষ এআইয়ের কাছে ব্যক্তিগত কথা বলে?

বার্লিনভিত্তিক ওয়েইজেনবাউম ইনস্টিটিউটের মনোবিজ্ঞানী জেনিফার হাসে বলেন, মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হলো আশপাশের জড় বা প্রযুক্তিনির্ভর বস্তুকেও মানবিক বৈশিষ্ট্য দেওয়া। যখন একটি এআই সহকারী সব সময় স্মার্টফোনে হাতের নাগালে থাকে এবং বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, তখন অনেকের কাছেই এটি নিয়মিত কথোপকথনের সঙ্গী হয়ে ওঠে।

তার মতে, এআই কাউকে সমালোচনা করে না বা সামাজিকভাবে বিব্রত করে না। ফলে অনেকেই এমন বিষয়ও সহজে শেয়ার করেন, যা বাস্তব জীবনে অন্য কারও সঙ্গে বলতে দ্বিধা বোধ করেন।

কেন এআইকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়?

জেনিফার হাসে ব্যাখ্যা করেন, আধুনিক ভাষাভিত্তিক এআই মডেলগুলোকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা ভদ্র, সহানুভূতিশীল এবং সহায়ক ভাষায় উত্তর দেয়। এ কারণে ব্যবহারকারীদের কাছে এআইকে নিরপেক্ষ, বোঝাপড়াসম্পন্ন ও বন্ধুসুলভ মনে হয়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই আচরণ প্রকৃত সহমর্মিতা বা নৈতিক বিচারবোধের প্রকাশ নয়; বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রতিক্রিয়ার ফল। ইতিবাচক উত্তর বারবার পেলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, যা সব সময় বাস্তবতার প্রতিফলন নাও হতে পারে।

বিচারহীন পরিবেশ মানুষকে আকৃষ্ট করছে

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বাস্তব জীবনে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেকেই অন্যের সমালোচনা, প্রত্যাখ্যান বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করেন। কিন্তু এআইয়ের সঙ্গে কথোপকথনে সেই ভয় থাকে না।

এআই ক্লান্ত হয় না, বিরক্ত হয় না এবং যেকোনো সময় দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য অনেক ব্যবহারকারীর কাছে এটিকে একটি নিরাপদ আলাপের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরছে।

সংকটময় পরিস্থিতিতে কতটা কার্যকর?

জেনিফার হাসে মনে করেন, এআই বিশেষভাবে দক্ষ বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে ধারা বা পুনরাবৃত্ত আচরণ শনাক্ত করতে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কেউ যদি দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের মানসিক চাপ বা সম্পর্কগত সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলে এআই সেই অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করে কিছু আচরণগত ধারা শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।

তার মতে, আত্মবিশ্লেষণ বা অভ্যাস বোঝার ক্ষেত্রে এআই একটি সহায়ক সরঞ্জাম হতে পারে। তবে এটি পেশাদার মনোচিকিৎসা বা মানবিক পরামর্শের বিকল্প নয়।

সামাজিক সঙ্গী হিসেবে এআই

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন এআই চ্যাটবট তৈরি করছে, যেগুলোকে ব্যবহারকারীর বন্ধু, সঙ্গী বা আবেগগত সহচর হিসেবে নকশা করা হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের মধ্যে এসব প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

গবেষকদের ভাষ্য, অনেক তরুণ এসব এআইকে কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং নিজেদের আবেগ বোঝা, অনুভূতি প্রকাশ করা এবং যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য বিশ্লেষণ, চিন্তা গোছানো কিংবা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় এআই কার্যকর সহায়ক হতে পারে। তবে জীবন পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত, গুরুতর মানসিক সংকট বা সম্পর্কের জটিল বিষয়ে কেবল এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন হলে পরিবার, বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা পেশাদার মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন