অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন সংস্থা চায় এইচআরএসএস

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব একই বাহিনী বা তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো সংস্থার হাতে না রাখার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির মতে, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সংগঠনটির নেতারা এসব কথা বলেন। আগামীকাল রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এইচআরএসএস এ সভার আয়োজন করে।

সভায় গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী কিংবা তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অথবা বিশেষ গুম তদন্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সভায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ—দুই আইনেই স্বতন্ত্র তদন্তপ্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। তদন্তের প্রক্রিয়া পরিবর্তন না হলে তা কার্যকর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে না।

তিনি বলেন, ‘নিজের বিচার কখনও নিজে করা যায় না।’ একই সঙ্গে দুটি আইনই প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।

সারা হোসেন আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এমন ব্যবস্থা নেই। এখন সংসদের স্থায়ী কমিটি আইন দুটি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, সেটিই বড় বিষয়।

আদালতের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেননি। যারা গেছেন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি। এখন সরকার ও আদালত কীভাবে জবাবদিহি ও প্রতিকারের সুযোগ তৈরি করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গুমের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকর ও স্বাধীন তদন্তক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে এমন আইন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গুমের ঘটনায় স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে। শুধু সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া কিংবা তাদের মাধ্যমে অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রেখে কমিশনকে নির্ভরশীল করে রাখলে কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ভুক্তভোগী মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, বর্তমান সংসদ মজলুমদের প্রতিনিধিত্ব করছে। গত ১৭ বছরে সংসদ সদস্য বা তাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের হাত দিয়ে এমন একটি আইন পাস হতে যাচ্ছে, যা গুমের পথকে আরও সহজ করে দিতে পারে।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধার্থে আইন করা হচ্ছে—এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। তারা যদি বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হন, তাহলে জনগণের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা হবে না।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা সরকারের দায়িত্ব নয়; জনগণের স্বার্থ রক্ষা ও তাদের কাছে জবাবদিহি করাই সরকারের দায়িত্ব।

সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘আমরা তো গুম করব না, তাহলে এত চিন্তা কেন?’ কিন্তু গুমের সুযোগ তৈরি করে রাখা উচিত নয়। তার ভাষায়, ‘দরজা খোলা থাকলে কেউ না কেউ সে দরজা দিয়ে একসময় ঢুকবে।’

সভায় বক্তারা গুম প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা, কার্যকর জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন