শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনা ভারতে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না: সংসদীয় কমিটিকে জানাল মোদি সরকার

নয়াদিল্লি, ৩১ জুলাই ২০২৬:

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না বলে ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) অনুরোধও ভারতের প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। 

ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির ‘Future of India-Bangladesh Relationship’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের সভাপতিত্বে পরিচালিত কমিটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, ভিসা কার্যক্রম, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবিক বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হলেও ভারত তার দীর্ঘদিনের নীতির প্রতি অটল রয়েছে। সেই নীতি অনুযায়ী, ভারতের মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না। কমিটি উল্লেখ করেছে, সরকার শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়নি। 

প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইন অনুযায়ী পর্যালোচনায়

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অনুরোধ বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সরকার জানিয়েছে। 

ভারতীয় সরকার এর আগে প্রকাশ্যেও জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে। 

মানবিক অবস্থান বজায় রাখার সুপারিশ

সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় সরকারকে শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের মানবিক ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দুই দেশের সম্পর্ক অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। 

বাংলাদেশিদের জন্য স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালুর আহ্বান

প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দ্রুত স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সীমিত থাকায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে নিয়মিত ভিসা কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছে। 

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নে দ্রুত উদ্যোগের পরামর্শ

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে সংসদীয় কমিটি দ্রুত নবায়ন আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে বর্তমান জলপ্রবাহের তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের মতামত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। 

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুতেও গুরুত্ব

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও ভারতের কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। 

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় কমিটির এই পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ভারত একদিকে শেখ হাসিনার বিষয়ে মানবিক অবস্থান বজায় রাখতে চাইলেও অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডকে প্রতিবেশী কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে রাজি নয়। একই সঙ্গে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনি প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক সংলাপ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন