মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

১৮০ দিনে বিএনপি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, পুরোনো রাজনীতিতেই ফিরেছে: নাহিদ ইসলাম

সরকার গঠনের ১৮০ দিনে বিএনপি নিদারুণভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও গত ছয় মাসে সরকার কার্যত পুরোনো আমলের স্বৈরাচারী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিতেই ফিরে গেছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে দলটির নীতি ও গবেষণা উপকমিটি ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ও ই-বুক প্রকাশ করে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সরকার আসার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এই তিনটি খাতের প্রতিটিতেই সরকার নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অধিকাংশ রক্ষা করতে পারেনি এবং দেশের চলমান সংকট নিয়ে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

সরকার পুরোনো ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোয় ফেরত যাচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথম ১৮০ দিনে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে তারেক রহমানের কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেই দেশকে পরিচালনা করার। শুধু ক্ষমতায় বসেছেন এবং পুরোনো পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যাসিস্টদের পরিকল্পনা ও নীতি অনুযায়ী তিনি দেশকে পরিচালনা করছেন, দেশকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছেন।’

নিত্যপণ্যের বাজার প্রসঙ্গে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, গত ছয় মাসে প্রতিটি পণ্যের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বেড়েছে। ভোগ্যপণ্য ও আমদানি বাজারে পুরোনো সিন্ডিকেটগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে বিএনপি তাতে নতুন অংশীদার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের লুটেরারা আবার ফিরতে শুরু করেছে। তিনি দাবি করেন, দুদকের নিষ্ক্রিয়তা ও বাজার সিন্ডিকেটের প্রত্যাবর্তন একই সূত্রে গাঁথা।

জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সরকার আসার পরে মার্চ-এপ্রিলে পাম্পগুলোতে ভয়াবহ পেট্রোল ও ডিজেল সংকট শুরু হয়েছিল। প্রচুর লাইন আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। সংসদে তখন জ্বালানিমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে, জ্বালানির সংকট নেই, এগুলো পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।’

তিনি অভিযোগ তোলেন, ‘পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে একটি কমিটি করে সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। সেখানে বিরোধীদল অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাবনা অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি’।

নাহিদ বলেন, সে সময় জ্বালানি তেলের রেকর্ড পরিমাণে মূল্য বৃদ্ধি পণ্য পরিবহন, সেচ ও কৃষির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ওই সংকটের পেছনে আমরা দেখেছি, স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। পাম্পের ভূ-গর্ভস্থ ট্যাংকে তেল মজুত করে রাখা হয়েছিল। সেই সিন্ডিকেট সরকার ভাঙতে পারেনি

তিনি আরও অভিযোগ তোলেন, অভিজ্ঞতাহীন, প্রভাবশালী গোষ্ঠী সরবরাহ ব্যবসায় প্রবেশ করেছে এবং উচ্চ কমিশনে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) ও পেট্রোবাংলায় পাইকারি বিক্রি শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ জ্বালানি কেনায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন অনুপস্থিত ছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় আমরা পাম্পের মজুতদারির ঘটনা দেখেছি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়েও খারাপ হয়েছে। বিরোধী দল, ভিন্নমত এবং সাংবাদিকদের ওপর সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা বাড়ছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলাকারীদের পরিবর্তে আহতদেরই আইনিভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। পুলিশকে ফের দলীয় বাহিনীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এছাড়া এনসিপির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার—যেমন মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়—একে একে বাতিল বা অকার্যকর করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে দুর্বল আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বিস্তৃত করা হয়েছে।

জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি অনুপস্থিত। এছাড়া নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার ঘটনাকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ‘জুলাই সনদ’ ভঙ্গের শামিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএনপি সরকারের গত ১৮০ দিন মূলত অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা এবং অসততার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন