দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। একই সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে শূন্যে নেমে এসেছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব পরিস্থিতিতেও চাপ রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির মূল্যায়নে, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি ও কিছু ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রে উদ্বেগের জায়গাই বেশি। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ ও বৈদেশিক লেনদেনে চাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।
শিল্প খাতের উৎপাদনেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। সিপিডির উপস্থাপিত হিসাবে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ শিল্প বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রবৃদ্ধিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এটি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা
সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও বড় ধরনের ঝুঁকি দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য পূরণ করতে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে বলে সিপিডির হিসাব।
বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি আশঙ্কা করছে। অর্থাৎ নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি থাকতে পারে।
সিপিডির উপস্থাপিত তথ্যে এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসার চিত্রও উঠে এসেছে।
সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বেড়েছে
সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সিপিডি। তাদের হিসাবে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতিতে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও পুরোপুরি অনুকূলে ছিল না। তবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না করাকে সরকারের দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন তিনি।
তার মতে, এমন একটি ভিত্তিমূলক দলিল না থাকায় সরকারের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে চাপ শিল্পে
জ্বালানি পরিস্থিতিকেও শিল্প খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা এবং কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ।
এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে বলে সিপিডি জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও প্রকৃত মজুরিতে চাপ
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে এসেছে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক বলে জানিয়েছে সিপিডি। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১০.৪ বিলিয়ন ডলার
বৈদেশিক খাতেও মিশ্র পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ঘুরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
চলতি হিসাবেও অবনতি হয়েছে। আগের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি বদলে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে সিপিডির তথ্যে উঠে এসেছে।
তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের কিছু উদ্যোগে ইতিবাচক মূল্যায়ন
সামগ্রিক উদ্বেগের মধ্যেও সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রোরেল ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় এবং নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফের উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩৬২ পদক্ষেপ নিয়ে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’
নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়িত পদক্ষেপ পর্যালোচনার জন্য সিপিডি ৩৬২টি পদক্ষেপ চিহ্নিত করেছে। এগুলো নয়টি শ্রেণিতে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সুশাসনসংক্রান্ত ১০৫টি ঘটনাও মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সিপিডি। ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মব সহিংসতা এবং নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজের পরামর্শ
অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি।
একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংকিং, এনবিআর, রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন এবং বেতন কমিশনকে যুক্ত করে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ তৈরির পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় উৎসে অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সিপিডি।
আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের সুপারিশও করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

