রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

তিন বিনিয়োগ সংস্থা একীভূত, যাত্রা শুরু ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা আরও সমন্বিত করার উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করেছে সরকার। তিন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে গঠিত নতুন সংস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’

‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) থেকে আইনটি কার্যকর করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

এর আগে গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হয়। নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য বিনিয়োগসংক্রান্ত সরকারি কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সংস্থার কাছে পৃথকভাবে যাওয়ার প্রয়োজন কমানো।

এক জায়গা থেকে বিনিয়োগসেবা

নতুন কর্তৃপক্ষের আওতায় বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্পসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।

এর ফলে দেশে নতুন বিনিয়োগ আনা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তার ক্ষেত্রে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অনুমোদন, লাইসেন্স ও সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর একক সেবাব্যবস্থা তৈরিও নতুন কর্তৃপক্ষের অন্যতম লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপিও একই কাঠামোয়

বেজার অধীনে থাকা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নতুন কর্তৃপক্ষের আওতায় আসবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পিপিপিএ যে ভূমিকা পালন করত, সেটিও নতুন ব্যবস্থার অংশ হবে।

ফলে বিনিয়োগ উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপন এবং পিপিপি প্রকল্প—তিন ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন কর্তৃপক্ষ সম্ভাবনাময় খাত ও প্রকল্প চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং বিনিয়োগের পথে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে কাজ করবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের সুপারিশের মতো দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটি পালন করতে পারবে।

নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে যাবে সম্পদ ও দায়িত্ব

একীভূত হওয়া তিন সংস্থার বিদ্যমান সম্পদ, দায়, চুক্তি, নথিপত্র এবং চলমান প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর অধীনে স্থানান্তরিত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

নতুন সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন এবং বিভিন্ন বিভাগ বা উইং গঠনের কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

কেন প্রয়োজন হলো একীভূতকরণ

বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু বা বড় বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমোদনে বিলম্ব, একই ধরনের তথ্য একাধিক জায়গায় জমা দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি।

তিন সংস্থাকে একীভূত করার মাধ্যমে এসব প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনেই বিনিয়োগকারীদের সব সমস্যার সমাধান হবে না। কর ও শুল্ক, ভূমি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা অন্য সরকারি সংস্থার অধীনেই থাকবে। ফলে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কতটা কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিনিয়োগ পরিবেশে বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন

সরকার আশা করছে, একই কর্তৃপক্ষের অধীনে বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পিপিপি কার্যক্রম আসায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার একটি একক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব হবে।

নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা অবশ্য নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীরা বাস্তবে কত দ্রুত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় সেবা পান, ডিজিটাল ও ওয়ান-স্টপ সেবা কতটা কার্যকর হয় এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় কতটা নিশ্চিত করা যায়—তার ওপর।

বিডা, বেজা ও পিপিপিএকে বিলুপ্ত করে একক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হলো। এখন এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের জন্য কতটা সহজ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই হবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর কার্যকারিতার প্রধান পরীক্ষা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন