শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ-লাওসের প্রথম পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠক: বাণিজ্য, শ্রম ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় জোর

ভিয়েনতিয়ান, লাওস | ১৩ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ ও লাও পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকের (লাওস) মধ্যে প্রথমবারের মতো Foreign Office Consultations (FOC) অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৩ আগস্ট লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়ানে অনুষ্ঠিত এ পরামর্শ বৈঠকের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের ৩৮ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা যুক্ত হলো।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং লাওসের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী অনৌপার্ব ভংনরকেও। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম, মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

FOC-তে দুই দেশ স্বীকার করে যে বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যকার বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। ফলে বাণিজ্য বহুমুখীকরণ এবং দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ লক্ষ্যে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ। বিশেষ করে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প চেম্বারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়।

লাওস বাংলাদেশের ওষুধ ও কৃষিপণ্য খাতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে এসব পণ্য লাওসের বাজারে আরও বেশি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ

বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো শ্রম সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ। বাংলাদেশ ও লাওস শ্রম সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

প্রস্তাবিত MoU-এর মাধ্যমে লাওসে আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং শ্রমবাজারে দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষ ও আধাদক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য লাওসের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ

দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি MoU প্রণয়নের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

এছাড়া তরুণ কূটনীতিকদের বিনিময়, পর্যটন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।

লাওসের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণ কৌশল সম্পর্কেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে Least Developed Country (LDC) status থেকে উত্তরণের কৌশল ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

ভিসা সহজ করার অনুরোধ

কনস্যুলার সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য লাওসের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধ জানানো হয়।

লাওসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হলে ব্যবসায়ী, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত বাড়ার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ICT, স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা

বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (ICT), স্বাস্থ্যসেবা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বিশেষ করে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন বা eco-tourism খাতেও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে লাওসের সমর্থন চাইল বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের প্রতি লাওসের সহযোগিতার প্রশংসা করে ঢাকা এ সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষ করে মিয়ানমারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে লাওসের অব্যাহত সহযোগিতা চাওয়া হয়।

লাওস আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।

ASEAN ও RCEP-এ বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় লাওসের সমর্থন

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বৈঠকটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লাওস বাংলাদেশের ASEAN Sectoral Dialogue Partner হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)-এর সদস্য হওয়ার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে লাওসের এই সমর্থন তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা

বাংলাদেশ ও লাওস উভয়ই জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশ। এ কারণে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল নিয়ে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা, সহনশীলতা বাড়ানো এবং জাতীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করতে climate adaptation and mitigation বিষয়ে সর্বোত্তম অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

৩৮ বছরের সম্পর্কে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যায়

১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম Foreign Office Consultations অনুষ্ঠিত হলো। ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ নীতি-সংলাপের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বৈঠকের শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানরা আলোচনার ফলাফল সংবলিত একটি Outcome Document স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে আলোচনায় চিহ্নিত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে ভবিষ্যতে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি তৈরি হলো।

বৈঠক শেষে লাওসের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অনৌপার্ব ভংনরকেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব ও তাঁর প্রতিনিধিদলের সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রথম FOC-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-লাওস সম্পর্ক কেবল ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন, জলবায়ু ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি বিস্তৃত অংশীদারত্বে রূপ নেওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন