শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

জাতীয় গ্যাস গ্রিডে আবারও সামিটের গ্যাস সরবরাহ শুরু, বাড়বে সরবরাহ

দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিটের ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (FSRU) থেকে জাতীয় গ্রিডে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (RLNG) সরবরাহ শুরু হয়।

সামিটের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ শুরুর সময় প্রতি দিন প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল। ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়িয়ে শনিবার রাত ২টার দিকে টার্মিনালের প্রায় ৫৫০ MMCFD পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাও (বাসস) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে সরবরাহ শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বৈরী আবহাওয়ায় বন্ধ ছিল সরবরাহ

এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে এলএনজি কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

শুক্রবার পরিস্থিতির উন্নতি হলে এলএনজি কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং সন্ধ্যায় পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়।

‘ধীরে ধীরে চাপ বাড়বে’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-এর চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বাসসকে জানান, সামিট শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে তাদের FSRU থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ ধীরে ধীরে বাড়বে এবং মধ্যরাতের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সরবরাহে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে এক্সিলারেট এনার্জির FSRU থেকেও গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সামিটের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, টার্মিনালের কারিগরি সক্ষমতা ও জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতার মধ্যে সর্বোচ্চ নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তির প্রত্যাশা

সামিটের সরবরাহ পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রাহকের জন্য সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যেসব শিল্পকারখানা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কম সক্ষমতায় পরিচালনা কিংবা জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ছে, তাদের জন্য সামিটের পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

গ্যাস সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ সহায়ক হবে বলে সামিট জানিয়েছে।

এক্সিলারেটের FSRU-তে আবারও কারিগরি সমস্যা

তবে সামিটের সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ার মধ্যেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত FSRU কারিগরি ত্রুটির কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ধ হওয়ার আগে ওই FSRU থেকে দৈনিক প্রায় ২৫০–৩০০ MMCFD গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। রাত ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়নি বলে জানানো হয়েছিল।

এর আগে গত ২১ জুলাই এলএনজি স্থানান্তরের সময় ওই টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল। ৬ আগস্ট আংশিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও ১৪ আগস্ট আবারও কারিগরি সমস্যায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে সামিটের সরবরাহ পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে এলেও জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকট কতটা দ্রুত কমবে, তা এক্সিলারেটের FSRU-সহ সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করবে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি ও তা পুনঃগ্যাসীকরণের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মহেশখালী উপকূলে থাকা FSRUগুলো আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় পাঠায়।

সামিটের FSRU-এর পূর্ণ সক্ষমতা প্রায় ৫৫০ MMCFD। তাই টার্মিনালটি পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হবে।

সামিটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই পেট্রোবাংলা ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ সম্ভব গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ অব্যাহত রাখা হবে।

এখন নজর সরবরাহের ধারাবাহিকতায়

একদিকে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে, অন্যদিকে এক্সিলারেটের FSRU-তে নতুন করে কারিগরি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় সামিটের ৫৫০ MMCFD সক্ষমতায় ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামগ্রিক সংকট নিরসনে সব উৎস থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সামিটের পক্ষ থেকে শনিবার রাত ২টার মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য জানানো হয়েছে। সরবরাহ স্থিতিশীলভাবে ওই মাত্রায় পৌঁছাতে পারলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য গ্রাহকের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন