শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

বুড়িগঙ্গা-তুরাগ দূষণ বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর দূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

তিনি বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো উদ্যোগ নিলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। নদী দূষণ বন্ধে সরকার, শিল্প মালিক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একই পরিকল্পনার আওতায় কাজ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী এবং নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোতে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের নিয়ে সভাটি আয়োজন করা হয়।

শিল্প মালিকদের সহযোগিতা চান মন্ত্রী

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে শিল্প মালিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানি যাতে কোনোভাবেই খাল বা নদীতে গিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (Effluent Treatment Plant) স্থাপন ও পরিচালনা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিল্প উদ্যোক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, দেশে কল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়বে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হবে। কিন্তু এর সঙ্গে পরিবেশ দূষণ বাড়তে দেওয়া যাবে না। শিল্পায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন শিল্প মালিকরা

মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিক সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর প্রতিনিধিরা শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ইটিপি পরিচালনাসহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়।

কেন্দ্রীয় ইটিপির বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে

শিল্প মালিকদের বক্তব্যের পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অন্যায়ভাবে হয়রানি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে শিল্প উদ্যোক্তাদের বাস্তবসম্মত সমাধানের সুযোগও দিতে হবে।

ইটিপিতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো বা সম্ভব হলে শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

বুড়িগঙ্গাকে টেমসের মতো করার লক্ষ্য

সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, বুড়িগঙ্গাকে লন্ডনের টেমস নদীর মতো পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক নদীতে রূপান্তর করা প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন।

তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, শিল্প মালিক, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য অংশীজন একসঙ্গে কাজ করলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যাকে টেমস নদীর মতো করে গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে শুধু বুড়িগঙ্গার বর্তমান দূষণ নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। তুরাগ নদীর উজান থেকে যাতে নতুন করে দূষণ নেমে না আসে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গাবতলী ও আশুলিয়ায় ঝুলন্ত সেতুর পরিকল্পনা

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীকে ঘিরে নান্দনিক ও পর্যটন সুবিধা তৈরির পরিকল্পনার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জানান, গাবতলী ও আশুলিয়ায় নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদনের জন্য নদীতে জাহাজ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নদী দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি এর আশপাশের পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গাকে নগরবাসীর জন্য একটি আকর্ষণীয় নদীকেন্দ্রিক স্থানে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

বুড়িগঙ্গায় ১৬৬, তুরাগে ৫৮ দূষণের উৎস

সভায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রূপরেখা’ শীর্ষক একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।

উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে মোট ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎসমুখ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীতে ১৬৬টি এবং তুরাগ নদীতে ৫৮টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎস রয়েছে।

এসব উৎসমুখের সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বলে সভায় জানানো হয়।

দূষণের উৎস বন্ধে কেন্দ্রীয় সেল

বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

এই সেলের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও অংশীজনের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করে দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, বন্ধ করা, নদী ও খালের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অবৈধ ড্রেন বন্ধ ও বর্জ্য অপসারণ

সভায় শিল্পবর্জ্যের উৎসভিত্তিক তালিকা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ইটিপি স্থাপন ও সেগুলো যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া অনুমোদনহীন ড্রেন শনাক্ত করে বন্ধ করা এবং খাল ও ড্রেন থেকে দীর্ঘদিনের বর্জ্য অপসারণ করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশে এসটিপি (Sewage Treatment Plant), ইটিপি এবং ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়ও কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নদীর তলদেশের বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নতুন করে বর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়—নদীর তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সভায় শিল্পবর্জ্যসহ সব ধরনের বর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধ করা, খাল ও ড্রেনের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং নদীর তলদেশের পুরোনো বর্জ্য অপসারণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

অংশীজনদের সমন্বয়েই সফলতা

সভায় বক্তারা বলেন, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দূষণ বহু বছর ধরে চলে আসা একটি জটিল সমস্যা। এর সঙ্গে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, অবৈধ ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জড়িত।

তাই শুধু একটি সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর দূষণ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, রাজউক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, নৌবাহিনী, শিল্প মালিক সংগঠন এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সভায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধি, শিল্প মালিক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পরিবেশ সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎস চিহ্নিত হওয়া এবং এসব উৎস বন্ধে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন সেই পরিকল্পনা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ নদীর ভবিষ্যৎ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন