শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

হরমুজ প্রণালি ‘পুরো নিয়ন্ত্রণে’—ট্রাম্পের দাবি, ইরানের সরাসরি প্রত্যাখ্যান

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওপর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখন উন্মুক্ত।

তবে তেহরান সরাসরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নজরদারি ও অনুমোদনের আওতাধীন। ফলে ওয়াশিংটনের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করছে ইরান।

‘যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মিথ্যা’

ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কনস্ট্রাকশন হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল জোলফাঘারি বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবিকে ‘মিথ্যা ও অসত্য’ বলে আখ্যা দেন।

তিনি বলেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি ও তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদে এই প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ নেই।

জোলফাঘারি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের ‘পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি বাহিনী অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমায়ি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ। এর মধ্য দিয়ে চলাচলের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক।’

তার ভাষ্য, প্রণালির কোনো গতিবিধিই IRGC নৌবাহিনীর নজর এড়াতে পারে না। পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের চেয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাহাজ চলাচলের তথ্য কী বলছে?

হরমুজ প্রণালিতে বাস্তবে কতটা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে, তা নিয়ে স্বাধীন শিপিং ডেটাও যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

রয়টার্সের উদ্ধৃত Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৯টি পণ্যবাহী জাহাজ অতিক্রম করেছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল ৫টি। তবে আগস্ট মাসে প্রতিদিন গড়ে যে ১২টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করত, বর্তমান সংখ্যা তারও নিচে।

তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ জাহাজই ইরান পরিচালিত বা অনুমোদিত রুট ব্যবহার করেছে।

যুদ্ধের আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। The Wall Street Journal-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অতিক্রম করত। যুদ্ধের পর মঙ্গলবার মাত্র ১৪টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি ইরান-সমন্বিত রুট ব্যবহার করেছিল।

অর্থাৎ, সামরিক উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি থাকলেও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি—শিপিং তথ্য অন্তত এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ট্র্যাকিং তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

তবে মার্কিন প্রশাসন বাণিজ্যিক জাহাজের ট্র্যাকিং-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, কিছু জাহাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিয়েছে। আবার সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা-সহায়তা বা এসকর্টের অধীনে চলাচলকারী কিছু জাহাজও উন্মুক্ত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

তবুও পর্যবেক্ষণযোগ্য জাহাজ চলাচলের সামগ্রিক হার অত্যন্ত কম এবং অনেক জাহাজ এখনো ইরানের সঙ্গে সমন্বিত রুট ব্যবহার করছে—এ বাস্তবতা হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ’ দাবিকে জটিল করে তুলেছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদেরও সংশয়

ট্রাম্পের দাবিকে শুধু ইরানই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না; পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মধ্যেও এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

The Wall Street Journal-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রেসিডেন্টের দাবি বাস্তব জাহাজ চলাচলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে সীমিতসংখ্যক জাহাজের চলাচলই দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটনের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ব্যবধান রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক নাও হতে পারে। নিরাপত্তাঝুঁকি ও বীমা ব্যয় কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো স্বাভাবিক রুটে ফিরতে অনাগ্রহী থাকতে পারে।

কারণ, কোনো সামুদ্রিক করিডোরের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ শুধু সামরিক উপস্থিতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেখানে নিরাপদ, পূর্বানুমানযোগ্য ও নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজে নিজেদের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক করতে চায় তেহরান

ইরান অবশ্য বিষয়টিকে শুধু যুদ্ধকালীন সামরিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখছে না। তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ ও নিরাপদ সামুদ্রিক করিডোর তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরাপদ নৌপথের স্থানাঙ্ক ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে।

এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েও ইরানের পার্লামেন্টে কাজ চলছে।

ইরানি আইনপ্রণেতা ভালিওল্লাহ বায়াতি জানিয়েছেন, পার্লামেন্টের সংশ্লিষ্ট কমিটি ওই পরিকল্পনার সাধারণ নীতিমালা এবং ১৪টি ধারার মধ্যে সাতটি অনুমোদন করেছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার একটি অংশে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের দৃষ্টিতে বৈরী দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও সরঞ্জামকে হরমুজ দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার কথা রয়েছে বলে ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে তেহরান সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি হরমুজে নিজের ভূমিকাকে রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যেও প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

কেন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি করছেন ট্রাম্প?

হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি কেবল সামরিক বাস্তবতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও জড়িত।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি ট্রাম্প প্রশাসনকে এমন একটি শক্তিশালী অবস্থানে তুলে ধরে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

এর অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, বীমা ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি—সবই বাড়তে পারে।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বার্তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টার অংশও হতে পারে—যাতে তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহপথ নিরাপদ রাখতে সক্ষম।

মূল প্রশ্ন এখন জাহাজ চলাচল

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তব সূচকেই এসে দাঁড়াচ্ছে—কতসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে এবং নিয়মিতভাবে প্রণালিটি অতিক্রম করছে?

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। ইরান বলছে, প্রতিটি চলাচল তাদের অনুমোদন ও তত্ত্বাবধানের আওতায়।

এদিকে শিপিং তথ্য বলছে, যুদ্ধের আগের তুলনায় জাহাজ চলাচল এখনো অনেক কম।

ফলে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য যতই তীব্র হোক, বাস্তব পরিস্থিতির সবচেয়ে নিরপেক্ষ সূচক হয়ে থাকছে প্রণালির ওপর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা, তাদের ব্যবহৃত রুট এবং বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা।

এই তিন সূচকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির ওপর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি বিতর্কের মধ্যেই থাকবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন