বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

সংস্কার ও রূপান্তরের দুই বছরে নতুন সক্ষমতায় আনসার-ভিডিপি

সংস্কার ও আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গাজীপুরের সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে সংস্কার ও রূপান্তরের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি গত দুই বছরের বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরেন।

মহাপরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে বাহিনীর কাঠামো, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও কল্যাণ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কার নেওয়া হয়েছে।

৬০ লাখ সদস্যের ডাটাবেজ

মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রায় ৬০ লাখ সদস্যকে এখন একটি সমন্বিত ডাটাবেজের আওতায় আনা হয়েছে। গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও প্লাটুন পর্যায়ের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাহিনীর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাহিনীর ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে সদস্য মোতায়েন, তথ্য সংরক্ষণ, বেতন-ভাতা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে চালু করা হয়েছে আনসার-ভিডিপি জব পোর্টাল।

ভবিষ্যতে প্রায় ৬০ লাখ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যমান এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ERP) ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এর আওতায় স্বেচ্ছাসেবকদের রক্তের তথ্য সমন্বিত একটি বড় পরিসরের ব্লাড ব্যাংক সেবা গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে মিটরিং সিস্টেম ও ডাটা সার্ভিস চালুর কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সাড়ে চার লাখ নতুন সদস্যকে প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পরিবর্তনকে সংস্কার কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন বাহিনী প্রধান।

তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চার লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন তরুণ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রশিক্ষণ শুধু নির্বাচন বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগ, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি কিংবা অন্যান্য জরুরি অবস্থায়ও প্রশিক্ষিত সদস্যরা বহুমুখী দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন।

গত দুই বছরে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য, পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের দক্ষতা ধরে রাখতে সতেজকরণ প্রশিক্ষণ জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অঙ্গীভূত আনসারদের সেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগ

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তায় অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ জোরদার করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের ‘রেস্ট প্রথা’ বাতিল এবং চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও জনবল সমন্বয়ের কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।

সদস্যদের বেতন, রেশন ও অন্যান্য প্রাপ্যতা সময়মতো নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চাকরি শেষে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অবসরকালীন গ্র্যাচুইটি ফান্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন ভূমিকার প্রস্তুতি

মহাপরিচালক বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যদের তৃণমূল পর্যায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ, কৃষিকাজে সহায়তা, স্বেচ্ছাশ্রম এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে জানান তিনি।

ভিডিপি ক্লাব পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ

প্রান্তিক পর্যায়ের ভিডিপি ক্লাবগুলোকে ‘সঞ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা, স্বেচ্ছাশ্রম ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বনির্ভর সমাজ গঠনে ভিডিপি-টিডিপি সদস্যদের আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনার কথা জানান বাহিনী প্রধান।

তার মতে, তৃণমূল পর্যায়ে থাকা বিপুলসংখ্যক সদস্যকে জাতীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবি

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাকে সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, বর্তমানে কঠোর ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করা হচ্ছে।

নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি বা দালালির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার দাবি, এর ফলে জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাহিনীতে সদস্য নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রশিক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ

বাহিনীর প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে নতুন ও বহুমুখী অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং সদর দপ্তরের কল্যাণ শাখাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মহাপরিচালক।

মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কল্যাণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম উন্নত করার পাশাপাশি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে বাহিনীর বড় স্বেচ্ছাসেবী জনবলকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কোরবানির সময় চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রমে বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করা হবে।

আধুনিক ও জনবান্ধব বাহিনী গড়ার প্রত্যয়

বাহিনীকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আনসার-ভিডিপি মহাপরিচালক।

তিনি বলেন, জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাহিনীর প্রায় ৬০ লাখ সদস্যের সক্ষমতাকে দেশের নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে। সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা আরও উন্নত করার মাধ্যমে বাহিনীকে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়াই লক্ষ্য।

মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদ, আনসার-ভিডিপি একাডেমির ভারপ্রাপ্ত কমান্ড্যান্ট উপমহাপরিচালক মো. সাইফুল্লাহ রাসেলসহ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সদস্যরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন