রাজধানীর ধানমন্ডিতে ১২ বছর বয়সী গৃহকর্মী রিক্তা মনির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বাদীপক্ষ আদালতে আগের অভিযোগ থেকে সরে এসে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করায় মামলাটির ভবিষ্যৎ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নিহত রিক্তা মনি সুনামগঞ্জ জেলার সালনা থানার নিজগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। অভাবের কারণে তার বাবা দিনমজুর শাহিন মিয়া মাসিক ৪ হাজার টাকা বেতনে তাকে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠান। পরিবারের দাবি, স্থানীয় দুই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয় এবং এ জন্য ১০ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ শুরুর কিছুদিন পর রিক্তা ভিডিও কলে মায়ের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিল। পরে তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সীমিত হয়ে যায়। একপর্যায়ে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে গৃহকর্ত্রীর পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া ১০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলেও পরিবারের অভিযোগ।
১৯ জুন সকালে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে জানতে পারেন রিক্তা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। পরে হাসপাতাল পরিবর্তনের তথ্য দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে গিয়ে তারা অ্যাম্বুলেন্সে রিক্তার মরদেহ দেখতে পান। পরিবারের অভিযোগ, মরদেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এরপর রিক্তার বাবা ধানমন্ডি থানায় গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে ঘটনাটি দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবস্থান ছিল যে, রিক্তা ভবনের বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যায়।
মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হলেও পরে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন শুনানির সময় বাদীপক্ষ আদালতে জানায়, ভুল বোঝাবুঝির কারণে হত্যা মামলা করা হয়েছিল এবং তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে তারা এখন বিশ্বাস করেন। ফলে আসামিদের জামিনে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
বাদীপক্ষের এই অবস্থান পরিবর্তনের পর ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মামলার সঙ্গে কোনো আপস হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বাদীপক্ষের আইনজীবী বলেন, এ বিষয়ে তার নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে তিনি মন্তব্য করেন, এমন ঘটনায় আপসের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে, রিক্তাকে কাজে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত বলে যাদের নাম এসেছে, সেই দুই মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না বা তাদের ভূমিকা তদন্তে কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিশু গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা, নিয়োগে মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত সংস্থার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

