সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কম্বোডিয়াভিত্তিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের ৩ বাংলাদেশি সদস্য গ্রেপ্তার

কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত অনলাইন প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায় এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে অনলাইনে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ (২৭), আবুল হাসান ওরফে নাঈম (২৪) ও সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা (২৪)। খুলনার হরিণটানা, খালিশপুর ও আড়ংঘাটা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সময় টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রতারক চক্রের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন। চক্রের সদস্যরা নিজেদের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে কম দামে বিমানের টিকিট কিনে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখায়।

তাদের কথায় বিশ্বাস করে ভুক্তভোগী ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিনিয়োগ শুরু করেন। প্রথমে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫১ টাকা জমা দেন। পরে লাভসহ টাকা উত্তোলনের সময় বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছে সিকিউরিটি মানি, ভিআইপি চ্যানেল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে ধাপে ধাপে আরও টাকা দাবি করা হয়।

প্রতারক চক্রের কথামতো ভুক্তভোগী বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বরে একাধিক দফায় টাকা পাঠান। শেষ পর্যন্ত তিনি মোট ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা প্রদান করে প্রতারিত হন।

পিবিআই জানায়, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রথমে দারুস সালাম থানায় একটি সিআর মামলা করেন। তদন্তকালে বিকাশ ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের অবস্থান শনাক্তের পর দারুস সালাম থানায় ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি তদন্তের জন্য স্বউদ্যোগে গ্রহণ করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।

তদন্তে জানা যায়, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মেহেদী হাসান সোহাগের নির্দেশনায় সুমাইয়া খাতুনের নামে খোলা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে প্রতারণার অর্থ লেনদেন করা হতো। সুমাইয়া খাতুনের একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক হিসাবে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ লাখ ১৪ হাজার ৫৫০ টাকা এবং ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত আরেক দফায় ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব অর্থ মেহেদী হাসানের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব এবং তার নির্দেশিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হতো। এ কাজে আবুল হাসান নাঈম সহযোগিতা করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তার হেফাজত থেকে সুমাইয়া খাতুনের নামে থাকা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের তিনটি এটিএম/ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই আরও জানায়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আসামিরা প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত চক্রটির একাধিক গ্রুপ ও পৃথক ডেস্ক রয়েছে এবং এসব গ্রুপে বাংলাদেশি এজেন্টও কাজ করে।

চক্রের সদস্যরা প্রথমে নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করত। বন্ধুত্বের পর পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করা হতো। পরে মেসেজ, ফোন কল ও ভিডিও কলের মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য প্রলুব্ধ করা হতো।

অভিযানে তিনটি ব্যাংকের এটিএম/ডেবিট কার্ড, বিভিন্ন ব্যাংক ও বিকাশে টাকা পাঠানোর রসিদের কপি, অনলাইন টেলিগ্রাম গ্রুপের তথ্য ও স্ক্রিনশট, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিবরণী, পাসপোর্টের কপি, কথোপকথনের সিডিআর, ছবি ও ভিডিও জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই জানিয়েছে, প্রতারণার সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং আত্মসাৎ করা অর্থের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে তদন্ত চলছে। চক্রের অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর এসআই মাহমুদুল হাসান। অতিরিক্ত আইজিপি পিবিআই মো. মোস্তফা কামালের তত্ত্বাবধানে এবং ডিআইজি পূর্বাঞ্চল আবুল কালাম আজাদের দিকনির্দেশনায় অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. এনায়েত হোসেন মান্নান পিপিএম-সেবার নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন