শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি ঘিরে নতুন বিতর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন এই চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরলেও, সমালোচকদের আশঙ্কা—এর কিছু দিক ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে।

চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান স্বাক্ষর করেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি আইনের সেকশন ১২৩-এর আওতায় সম্পাদিত হয়েছে, যা সাধারণত বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং নিরাপত্তা তদারকিতে দুই দেশের সহযোগিতার আইনি ভিত্তি তৈরি করে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু

চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট) সুযোগ পেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই।

এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক বিস্তাররোধ (নন-প্রলিফারেশন) বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা গেলেও একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সামরিক কর্মসূচিতেও প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এমন সম্ভাবনা নির্ভর করে বাস্তবায়নের শর্ত, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর ওপর।

ট্রাম্পের বক্তব্য বনাম বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, সৌদি আরবকে কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হবে না এবং দেশটি শুধুমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা পাবে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি বিবৃতিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ না থাকায় বিভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ থেকে যাচ্ছে। ফলে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশের দাবি জোরালো হয়েছে।

কংগ্রেসে আপত্তি

চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও আলোচনা শুরু হয়েছে। সিনেটর এড মার্কি একটি বিল উত্থাপন করেছেন, যেখানে প্রস্তাব করা হয়েছে—সৌদি আরবকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কর্মসূচি পরিত্যাগের অঙ্গীকার করতে হবে। এরপরই কেবল চুক্তি কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু সৌদি আরবের জ্বালানি নীতির বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে এখন সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি অঞ্চলটির একাধিক দেশ উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের পথে এগোয়, তাহলে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ

কিছু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞের মতে, একদিকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি একই অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের বার্তা দিতে পারে।

অন্যদিকে, সমর্থকদের যুক্তি হলো—কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের শর্ত নিশ্চিত করা গেলে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনও প্রকাশ না হওয়ায় এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে এটি যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, পারমাণবিক বিস্তাররোধ নীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন