আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
তারিখ: ২০ জুলাই, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যবহারকারীদের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া বিভিন্ন ফিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার একটি নতুন এআই ফিচারকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষক, গোপনীয়তা অধিকারকর্মী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি মেটা ইনস্টাগ্রামে এমন একটি এআই সুবিধা চালু করে, যেখানে ব্যবহারকারীর পাবলিক অ্যাকাউন্টের তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে এআই-নির্ভর প্রতিচ্ছবি (Likeness) তৈরির সুযোগ যুক্ত করা হয়। ব্যবহারকারীদের পূর্বানুমতি নেওয়ার পরিবর্তে ফিচারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় রাখা হয় এবং এটি ব্যবহার না করতে চাইলে সেটিংস থেকে নিজ দায়িত্বে বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
এই নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সমালোচনামূলক ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তীব্র জনমতের মুখে মেটা মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ফিচারটি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে স্বীকার করে, ফিচারটির বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
গোপনীয়তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি পৃথক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক একটি বিস্তৃত প্রবণতার অংশ। তাদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীদের সক্রিয় সম্মতির পরিবর্তে ‘অপ্ট-আউট’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যেখানে কোনো সুবিধা বন্ধ করতে চাইলে ব্যবহারকারীকে নিজে উদ্যোগ নিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের (EFF) জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞ থোরিন ক্লোসোভস্কি ব্যবহারকারীদের দ্রুত প্রতিক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জনসচেতনতা ও তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মেটাই নয়; গুগল, ড্রপবক্স এবং লিঙ্কডইনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এআই সুবিধা ব্যবহারকারীদের জন্য ডিফল্টভাবে চালু করছে। এতে অনেক ব্যবহারকারী অনিচ্ছাকৃতভাবেই নতুন প্রযুক্তির আওতায় চলে যাচ্ছেন।
বোস্টন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক উড্রো হার্টজগ বলেন, অধিকাংশ মানুষ ডিভাইস বা সফটওয়্যারের ডিফল্ট সেটিংস পরিবর্তন করেন না। ফলে কোম্পানিগুলো যখন কোনো নতুন সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় রাখে, তখন ব্যবহারকারীরা সচেতন না হয়েই সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যান।
বিশেষজ্ঞরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ উপাত্ত সুরক্ষা বিধিমালা (GDPR)-এর ধারা ২৫-এর উদাহরণ তুলে ধরছেন। এই নীতিমালায় প্রযুক্তি নকশার শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্পকে ডিফল্ট হিসেবে রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
কনজিউমার ফেডারেশন অব আমেরিকার এআই ও প্রাইভেসি বিভাগের পরিচালক বেন উইন্টার্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সমন্বিত ফেডারেল গোপনীয়তা আইন না থাকায় অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে। তিনি এ ধরনের বিষয়ে আরও কার্যকর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ব্যবহারকারীদের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া এআই-ভিত্তিক ছবি বা প্রতিচ্ছবি তৈরির প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে ডিপফেক, পরিচয় অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। তাদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর অধিকার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যবহারকারীর আস্থা ধরে রাখতে হলে ‘ডিফল্ট অন্তর্ভুক্তি’ নয়, বরং ‘স্পষ্ট সম্মতির ভিত্তিতে অংশগ্রহণ (Opt-in)’ নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

