সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে পরকীয়া, পারিবারিক ভাঙন ও বিবাহবিচ্ছেদ: বদলে যাওয়া সমাজের এক নীরব সংকট

বাংলাদেশের সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর এবং বিতর্কিত বিষয়। একসময় বিষয়টি পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং আইনি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পরিবার ভাঙন, দাম্পত্য কলহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে পরকীয়ার ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরকীয়া উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা প্রাণ-পরিসংখ্যান জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, তালাকপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৩ শতাংশ তাদের বিচ্ছেদের জন্য পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে দায়ী করেছেন। এটি জরিপে উল্লেখিত সর্বোচ্চ কারণ। অর্থাৎ, বিবাহবিচ্ছেদের কারণগুলোর মধ্যে পরকীয়াই ছিল সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত কারণ।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরকীয়াকে কেবল নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরকীয়া কোনো সম্পর্কের শুরু নয়, বরং দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সংকটের বহিঃপ্রকাশ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব, পারস্পরিক অবিশ্বাস, একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, কর্মসূত্রে দীর্ঘ সময় আলাদা থাকা, যৌন ও মানসিক অসন্তোষ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা মাদকাসক্তির মতো কারণগুলো অনেক সময় বিবাহিত জীবনে গভীর সংকট তৈরি করে। সেই সংকট থেকেই কেউ কেউ বিকল্প সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার পরকীয়ার আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। তবে একই সঙ্গে গোপন যোগাযোগ, পুরোনো সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, নতুন পরিচয় গড়ে তোলা এবং আবেগভিত্তিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগও বেড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে গবেষকরা প্রযুক্তিকে একমাত্র দায়ী করতে নারাজ। তাদের মতে, প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম। সম্পর্কের ভিত শক্ত থাকলে প্রযুক্তি সমস্যা তৈরি করে না। বরং যখন পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন প্রযুক্তি সেই দুর্বলতাকে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে পরকীয়ার আলোচনা করতে হলে সম্পর্কের গুণগত মান, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

পরকীয়ার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সন্তানরা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বাবা-মায়ের মধ্যে অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব এবং বিচ্ছেদের পরিবেশ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, আচরণগত সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইনবিদদের মতে, বাংলাদেশে পরকীয়ার কারণে সরাসরি শাস্তির বিধান আগের মতো না থাকলেও এটি পারিবারিক বিরোধ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল নৈতিক বা সামাজিক নয়, অনেক ক্ষেত্রেই আইনি জটিলতার কারণ হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় চিন্তাবিদরা মনে করেন, পরকীয়া পরিবার ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মেই বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ততা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং আত্মসংযমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাদের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার এবং ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাওয়াও পরকীয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুধুমাত্র নৈতিকতার আলোকে সমস্যাটিকে বিচার করলে এর বাস্তব কারণগুলো অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মতে, আধুনিক জীবনের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের ব্যস্ততা, পারিবারিক সময়ের অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও দাম্পত্য সম্পর্ককে দুর্বল করে তুলছে। ফলে পরকীয়ার ঘটনা প্রতিরোধে শুধু সামাজিক নিন্দা নয়, সম্পর্ক উন্নয়ন, কাউন্সেলিং এবং মানসিক সহায়তাও প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরকীয়া মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে অপরের প্রতি সময় ও মনোযোগ দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে পরকীয়ার ক্রমবর্ধমান আলোচনা আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। এটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট নয়; বরং পরিবার, সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সামাজিক বাস্তবতা। তাই পরকীয়াকে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে এর পেছনের সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খোঁজাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন