অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

টিকা কেনা ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, ৬০ দিনে প্রতিবেদন দেবে কমিশন

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিরূপণে সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

হামের টিকা কেনা ও বিতরণে ‘বিলম্ব, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার’ অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়-দায়িত্ব নিরূপণে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করেছে সরকার। বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

হাই কোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানকে কমিশনের সভাপতি করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলাম।

কমিশনকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

যে সময়ের দায়-দায়িত্ব খতিয়ে দেখবে কমিশন

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে হামের টিকা কেনা ও বিতরণে কী ধরনের বিলম্ব, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্ত করবে কমিশন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর সৃষ্ট বিরূপ প্রভাবের অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের লক্ষ্যে এ কমিশন গঠন করা হয়েছে।

কমিশন এসব ঘটনার কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের দায়িত্ব চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ করবে।

টিকা সংকট ও শিশু মৃত্যুর প্রেক্ষাপট

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০৫ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় এ রোগের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেশজুড়ে রোগটির প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে এপ্রিল-মে মাসে টিকার সংকটের বিষয়টি সামনে এলে সমালোচনা তীব্র হয়। টিকা সংগ্রহে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়।

টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন

২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিকা সংগ্রহ করত সরকার। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল দাতাদের সহায়তা। তবে ২০২৫ সালে টিকা কেনার ব্যয় রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহের পথে এগোয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার বিরূপ পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কারণেও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। মার্চে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে টিকাদান কর্মসূচি যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

ইউনিসেফের একাধিক চিঠি ও সতর্কবার্তা

হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গত ২০ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। সেখানে তিনি জানান, টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছিল ইউনিসেফ। এ বিষয়ে অন্তত ১০টি বৈঠকও হয়েছিল।

বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতির’ কথা জানিয়ে জাতীয় নির্বাচনের দুদিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে রানা ফ্লাওয়ার্সের পাঠানো একটি চিঠি নিয়েও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

নতুন সরকারের সময়েও মৃত্যু অব্যাহত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের সময়েও হামে মৃত্যু বন্ধ হয়নি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও রোগটির বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। হামে ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়ানোয় দেশে-বিদেশে সমালোচনা চলছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে আট মাস পর টিকা কেনা ও বিতরণ নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হলো।

কমিশনের কার্যক্রমে সহায়তা দেবে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ তদন্ত কমিশনকে প্রয়োজনীয় সচিবিক সহায়তা দেবে। কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী তদন্তের খরচ বহন এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থাও করবে বিভাগটি।

‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬’-এর অধীনে এ তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন