সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ইরানে পারমাণবিক হামলার শঙ্কা, ট্রাম্পকে নিয়ে কার্লসনের বিস্ফোরক দাবি

৭ নভেম্বরের মধ্যে হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ট্রাম্প—কার্লসনের দাবি; ওয়াশিংটন বলছে, সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানে পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দিতে পারেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন। তাঁর অভিযোগ, ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দেওয়ার কোনো ঘোষণা আসেনি। মার্কিন কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে কার্লসন দাবি করেন, মধ্য ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত একটি স্থাপনা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ধারণা, সেখানে ইরান আবারও পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়নি।

পিক্যাক্স মাউন্টেন নিয়ে কার্লসনের দাবি

কার্লসনের দাবি, পিক্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো আনুমানিক ৩০০ ফুট পুরু কঠিন গ্রানাইট শিলায় সুরক্ষিত। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে এসব স্থাপনায় কার্যকর হামলা চালানো কঠিন হওয়ায় সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি সামরিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একজন অজ্ঞাত পর্যবেক্ষককে উদ্ধৃত করে কার্লসন বলেন, নেতানিয়াহু এ বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রতিদিন ফোন করছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রকাশ্য বক্তব্য তিনি তুলে ধরেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

কার্লসন আরও অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরুর জন্য চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে অভিযোগ

কার্লসনের মতে, নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার তাগিদও ইরানে নতুন হামলার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। তা না হলে তিনি ক্ষমতা হারাতে পারেন এবং তদন্ত ও সম্ভাব্য কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে কার্লসনের এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব বিশ্লেষণ ও অভিযোগ; এগুলোকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।

কার্লসন আরও দাবি করেন, দোহায় প্রস্তুত হতে থাকা ইরান-সংক্রান্ত শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আবুধাবি সফর ও উপসাগরীয় অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ

কার্লসনের দাবি, ইরানে বড় ধরনের হামলার পক্ষে সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর গোপনে আবুধাবি সফর করেছিলেন নেতানিয়াহু। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা তাঁর প্রস্তাবে সরাসরি আপত্তি জানান বলে দাবি করেন এই ভাষ্যকার।

অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গে কার্লসন বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত উপসাগরীয় অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। তাঁর দাবি, শুধু অক্টোবর মাসেই হরমুজ প্রণালিতে বিশ্বের প্রায় ৮৫০টি বড় তেলবাহী জাহাজের মধ্যে অন্তত ১১টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য তাঁর পোস্টে স্পষ্ট নয়।

কার্লসন আরও সতর্ক করেন, পিক্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে পারস্য উপসাগরের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ১০ কোটি মানুষের সুপেয় পানির সরবরাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

পারমাণবিক হামলা নিয়ে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা

কার্লসনের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া উত্তেজনায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি লেখেন, প্রথম পারমাণবিক হামলার পর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে এবং তা মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

কার্লসন আরও অভিযোগ করেন, ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন পারমাণবিক যুদ্ধনীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন এনেছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত বা ‘ট্যাকটিক্যাল’ পারমাণবিক অস্ত্রের প্রথম ব্যবহার সহজ করতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো নীতিগত নথি বা সরকারি সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তিনি উল্লেখ করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

৭ নভেম্বরের মধ্যে সিদ্ধান্তের দাবি

কার্লসন দাবি করেন, আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে ট্রাম্প ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আলোচনা কঠিন হলেও ইরানি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা নতুন সংঘাতের বদলে শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টাকে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন বলে জানান কার্লসন।

ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত

কার্লসনের দাবির প্রসঙ্গে উঠে এসেছে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কথোপকথন। সেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের এক বা দুটি পারমাণবিক স্থাপনা এখনো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ১০ মিনিটের মধ্যেই সেখানে আঘাত হানতে পারে।

পিক্যাক্স মাউন্টেনের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ওই এলাকার জন্য তাঁর কাছে সামরিক পরিকল্পনা রয়েছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। তবে তিনি পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দেওয়ার কথা বলেননি।

এর আগে গত ১৬ অক্টোবর নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপ নিয়ে প্রতিবেদন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসন স্পর্শকাতর সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করে না। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে ট্রাম্প সব বিকল্প উন্মুক্ত রেখেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, হামলা শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, ইরান পিক্যাক্স মাউন্টেন কমপ্লেক্সে যেকোনো ধরনের পারমাণবিক তৎপরতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে হামলা চালানো হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন