রংপুর বিভাগের ১১ উপজেলায় মিলছে ইলিশ; গত মৌসুমে আহরণ ৪৮ টন, নৌকা ও কারিগরি সহায়তার সংকটে বিপাকে জেলেরা
একসময় ইলিশ বলতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর কথাই মনে করা হতো। তবে এখন উত্তরের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও যমুনা নদীতেও মাঝেমধ্যে মিলছে রুপালি এই মাছ। রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় ইলিশ ধরা পড়ছে। মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে এ অঞ্চলে ইলিশ আহরণের সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে। তবে নৌকার সংকট, মাছ ধরার ব্যয় ও কারিগরি সহায়তার অভাবে জেলেরা প্রত্যাশিত পরিমাণে ইলিশ আহরণ করতে পারছেন না।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এ তিন জেলায় ৪৮ টন ইলিশ ধরা পড়েছিল। চলতি বছরও ইলিশ আহরণ বাড়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গত ২৯ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর জেলেরা আবার নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন।
১১ উপজেলায় মিলছে ইলিশ
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গাইবান্ধার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলাতেও এ মাছ ধরা পড়ছে।
ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীসহ সংশ্লিষ্ট নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া গেলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় এর পরিমাণ কম। মৎস্য বিভাগের হিসাবে, প্রতি বছর এ তিন জেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টন ইলিশ আহরণ করা হয়।
একসময় লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর গঙ্গাচড়া-মহিপুর এলাকাতেও ইলিশ পাওয়া যেত। তবে গত পাঁচ-সাত বছরে সেখানে ইলিশের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে মৎস্য বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়।
নদীর নাব্যতা সংকট বড় বাধা
মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, উত্তরের নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ থাকলেও নাব্যতা সংকট মাছ আহরণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও নৌকার অভাবেও মাছ ধরা ব্যাহত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় মাঝেমধ্যে ইলিশের দেখা মিলছে। কিন্তু নদীগুলোর নাব্যতা সংকটের কারণে জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ ধরতে পারছেন না। কারিগরি সহায়তার সংকটের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা সংকটের কারণে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রাপ্যতা কমছে। নদীগুলো খননের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ অঞ্চলে ইলিশ ও দেশীয় অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নদীর সঙ্গে সাগরের সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ
অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা জুবায়ের আলী বাসসকে বলেন, ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ। সাগরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে, এমন নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্রের স্রোত বাড়লে এ নদীতে ইলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।
তিনি বলেন, একসময় তিস্তা নদীও খরস্রোতা ছিল। তখন সাগর থেকে ইলিশ তিস্তা নদীতে আসত। এ অঞ্চলে ইলিশের বিচরণ বাড়াতে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
জুবায়ের আলীর মতে, নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রংপুরের নদ-নদীতেও ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
কম ইলিশে খরচ তুলতে পারছেন না জেলেরা
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার মাঝিপাড়া এলাকার মৎস্যচাষি নয়ন চন্দ্র বাসসকে বলেন, চলতি মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। নিষেধাজ্ঞার সময় প্রণোদনা হিসেবে ২৫ কেজি চালও পেয়েছেন তিনি।
কুড়িগ্রামের জেলে কাঞ্চন কুমার বলেন, জেলেদের মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে আগের মতো নদীতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাছ ধরতে গেলে অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়, এর সঙ্গে নৌকা ভাড়াও রয়েছে। যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে অনেক সময় খরচ ওঠে না।
তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্রের আধা কেজির কম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর ধারণা, কালীপূজা পর্যন্ত নদীতে ইলিশ পাওয়া যেতে পারে। এরপর মাছের পরিমাণ কমে আসতে পারে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের জেলে আব্দুল গনি বলেন, চলতি বছরে তাঁরা তিস্তা নদী থেকে ১৫ কেজি ইলিশ ধরেছেন। নৌকার সংকট ও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় মাছ আহরণে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বলেন, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলার তুলনায় তাঁর উপজেলায় ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার সময় ১ হাজার ৬০০ জেলেকে চাল সহায়তা
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে চলতি মৌসুমে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের অন্যান্য এলাকার মতো এ তিন জেলাতেও ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। এ সময়ে ১ হাজার ৬০০ জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরকার ২০০৩-০৪ অর্থবছর থেকে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। পাশাপাশি মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ আহরণ, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ইলিশ উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নাব্যতা ফিরলে নতুন সম্ভাবনার আশা
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে এ অঞ্চলে ইলিশসহ দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে। নদী খননের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে উত্তরের নদ-নদীতে ইলিশ আহরণ বাড়াতে নদীর নাব্যতা, জেলেদের নৌকা ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

