সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দাবি ৩০ হাজার, বর্তমানে কত?

মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন, নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় শ্রমিকেরা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বর্তমান সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী এই বেতন নির্ধারণ করা হয়। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বিবেচনায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন শ্রমিকদের একাংশ।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রোববার (১ নভেম্বর) তৈরি পোশাক খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বর্তমানে কোন গ্রেডে কত বেতন?

২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের পাঁচটি গ্রেডে ভাগ করে মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়।

এই কাঠামোয় প্রথম গ্রেডে মোট মাসিক মজুরি ১৪ হাজার ৭৫০ টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে ১৪ হাজার ১৫০ টাকা এবং তৃতীয় গ্রেডে ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

এ ছাড়া চতুর্থ গ্রেডে ১৩ হাজার ২৫ টাকা এবং পঞ্চম গ্রেডে সর্বনিম্ন ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়।

অন্যদিকে পোশাকশিল্পের কর্মচারীদের জন্য পৃথক চারটি গ্রেড রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ গ্রেডে মাসিক মজুরি ১৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং শিক্ষানবিশ কর্মচারীদের জন্য ৯ হাজার ৯৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, এসব অর্থ গ্রেডভিত্তিক মোট মাসিক মজুরি। শ্রমিকের মূল বেতন বা বেসিক স্যালারি এবং মোট মজুরি এক নয়।

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন

বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকেরা।

দাবি বাস্তবায়িত হলে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বাড়বে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ বিদ্যমান কাঠামোর তুলনায় বৃদ্ধির হার হবে ১৪০ শতাংশ।

গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এই দাবিতে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকেরা।

আন্দোলনের সময় কয়েকটি এলাকায় সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নতুন মজুরি বোর্ডের দায়িত্ব কী?

শ্রমিকদের দাবি ও চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধিত ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, মজুরি বোর্ড সংশ্লিষ্ট শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করবে।

এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শিল্পের সক্ষমতাসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বিবেচনায় আসতে পারে।

বোর্ডের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করবে। পরবর্তী সময়ে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন মজুরি কার্যকর করা হবে।

তবে নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মজুরি কত নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

তিন দশকে যেভাবে বেড়েছে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রথম ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১৯৯৪ সালে। সে সময় শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল মাত্র ৯৩০ টাকা।

পরবর্তী সময়ে ২০০৬ ও ২০১০ সালে মজুরি কাঠামো সংশোধন করা হয়।

২০১৩ সালে সর্বনিম্ন মজুরি বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে সাতটি গ্রেডে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়। তখন সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ৮ হাজার টাকা।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে পাঁচটি গ্রেডে নতুন কাঠামো প্রণয়ন করে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি বৃদ্ধি পায় ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিল্পের সক্ষমতা

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের আলোচনায় একদিকে রয়েছে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি। অন্যদিকে রয়েছে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের সঙ্গে শ্রমিকদের আয়ের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।

একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির ফলে কারখানাগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং উৎপাদন সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই নতুন মজুরি বোর্ডের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সরকারের গঠিত বোর্ডের সুপারিশের পরই স্পষ্ট হবে দেশের লাখ লাখ পোশাকশ্রমিকের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো কেমন হতে যাচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন