সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

পোশাকশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও উৎপাদন সচল রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড, সহিংসতা বন্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার

দেশের তৈরি পোশাক খাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে তিনি এসব নির্দেশনা দেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের উৎপাদন অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়েছেন।

একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি

রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা।

রোববার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির অবনতির কারণে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শতাধিক পোশাক কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড

শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সকালে তৈরি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।

বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।

বোর্ডে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পারিবারিক চাহিদা এবং শিল্প খাতের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করবে বোর্ড।

তবে বোর্ডের প্রথম বৈঠকের তারিখ কিংবা নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন। সরকার সেই দাবি বাস্তবায়ন করেছে। এখন আলোচনার মাধ্যমে মজুরিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

কারখানা সচল রাখতে মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোনো কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে থাকলে তা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

আন্দোলনে উসকানির অভিযোগ সরকারের

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

তাঁর দাবি, দেশের বাইরে থেকেও কিছু মহল শ্রমিক অসন্তোষে উসকানি দিয়ে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরকার জানিয়েছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ থাকলেও সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনা আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হবে।

বিদেশ সফর বাতিল শ্রমমন্ত্রীর

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে পূর্বনির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। পরে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন মজুরি কাঠামোর অপেক্ষায় শ্রমিকেরা

মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং মালিকপক্ষের আর্থিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, শ্রমিকদের আস্থা অর্জন এবং রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন