ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী
শ্রমিক বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০০টি পোশাক কারখানায় রোববারের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দিনভর উত্তেজনা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর বিকেল ৩টার দিকে শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
রোববার (১ নভেম্বর) গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আমজাদ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
১০০ কারখানায় সাধারণ ছুটি
শিল্প পুলিশের এসপি আমজাদ হোসেন জানান, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের প্রায় ১০০টি পোশাক কারখানায় আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সমন্বয়ে গঠিত যৌথ দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে।
তিনি জানান, দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার পর বেলা ৩টার দিকে আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। এরপর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও কয়েকটি পোশাক কারখানার ফটকে ভাঙচুর চালানো হয়। মৌচাক কাটার এলাকায় একটি ট্রাফিক পুলিশ বক্সও ভাঙচুর করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। আনসার অ্যাকাডেমির সামনেও পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় স্থাপনা ও যানবাহনের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা যায়নি।
তিন স্থানে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস
অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ তারিকুল ইসলাম বলেন, বিক্ষোভ চলাকালে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি কারখানার গোডাউনসহ মোট তিনটি স্থানে আগুন দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হলেও সড়কে দীর্ঘ অবরোধ থাকায় পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় মহাসড়কের উল্টো পথ ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সকাল থেকে মহাসড়কে শ্রমিকদের অবস্থান
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন চলছে। এর ধারাবাহিকতায় রোববার সকাল থেকে গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর ও আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে কোনাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের একাংশ একটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। এ সময় দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
শ্রমিক ও পুলিশ সূত্র জানায়, সকালে শ্রমিকেরা প্রথমে নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করলেও কিছুক্ষণ পর কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরে লাঠিসোঁটা হাতে হাজারো শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ যাত্রী ও দূরপাল্লার পরিবহনের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অবস্থান
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে দাবি আদায়ের নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোনাবাড়ী, মৌচাক ও সফিপুরসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ করছেন। সরকার শ্রমিকদের বেতন পর্যালোচনায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও অনেক কারখানায় অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। রাতে অবরোধ তুলে নিলেও রোববার সকালে আবারও তাঁরা সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

